ভোট এলেই আতঙ্ক তাড়া করে লতিফা-অর্পিতাকে

46

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ : লতিফা বেওয়া, অর্পিতা সাহা। ভিন সম্প্রদায়ের দুই মহিলা। কিন্তু দুজনের ভাগ্য যেন একই সুতোয় বাঁধা। ভোট এলেই শিউরে ওঠেন দুজন। অতীত আজও তাড়া করে বেড়ায় তাঁদের। ভোটের বুথেই তাঁরা হারিয়েছেন স্বামীদের। এখনও ওই অভিশপ্ত বুথের পাশ দিয়ে গেলে চোখের জলে কাপড়ের আঁচল ভেজে একজনের। বুথে গিয়ে স্বামীর স্মৃতি খুঁজে বেড়ান। অন্যজন আতঙ্কে বুথমুখোই হতে চান না।

২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন। দুই রাজনৈতিক দলের লড়াই। তাতেই বলি হতে হয় অর্পিতা সাহার স্বামী অমৃত সাহাকে। রায়গঞ্জ শহরের দেবীনগর দেবীতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বুথের মধ্যেই একের পর এক গুলি করে তাঁকে খুন করে দুষ্কৃতীরা। ২০১৩ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েছিল ছেলে। হঠাৎ সেখানে গুলি-বোমার লড়াই শুরু হয়। ছেলের প্রাণ বাঁচাতে বাড়ির পাশে বুথে ছুটে যান বাবা আবদুল আজিজ। এলাকার সিপিআই কর্মী। বুথেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয় তাঁকে। ঘটনাটি ঘটেছিল ইটাহার ব্লকের গুলন্দর গ্রাম পঞ্চায়েতের বড়বিল্লা গ্রামে।

- Advertisement -

এছাড়াও ২০১৮ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনে ইটাহার ব্লকের সোনাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুথে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার রাজকুমার রায়ের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ পাওয়া যায় রায়গঞ্জ শহরের সোনাডাঙ্গি এলাকায় রেললাইনের ধারে। সেই মৃত্যু রহস্যের কিনারা এখনও হয়নি। সেবার পঞ্চায়েত ভোটে উত্তর দিনাজপুর জেলায় চারজনের প্রাণ গিয়েছিল। সামনে আবার ভোট। সেই ভোট কতটা রক্তক্ষয়ী হবে, তার আতঙ্কেই অনেকের রাতের ঘুম উড়েছে। লতিফা বেওয়া বলেন,বুথে যাই স্বামীর স্মৃতির টানে। অর্পিতা সাহার বক্তব্য,ভোট দিতে গিয়ে স্বামীকে হারিয়েছি, আর বুথে নয়।

কী হয়েছিল সেদিন? ঘটনাস্থল রায়গঞ্জের দেবীতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়। ওই বুথেই ভোট দিতে গিয়েছিলেন দেবীতলার বাসিন্দা, পেশায় আলমারি কারখানার কর্মী অমৃত সাহা। ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। বুথের সবকটা ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ ছিল। শুধু একটা দরজা দিয়ে লোকজন ঢুকছিল। অর্পিতাদেবী বলেন, স্বামীর সঙ্গে আমি সহ বেশ কয়েকজন ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। সকাল আটটা নাগাদ হঠাৎ চারপাশ থেকে একদল মুখ ঢাকা দুষ্কৃতী এসে বুথ দখল করে বোমা ও গুলি ছুড়তে থাকে। বুথ দখলের প্রতিবাদ করায় আমার স্বামীকে বুথের ভিতরেই তারা গুলি করে খুন করে। ভয়ে বুথের অফিসার ও লাইনে দাঁড়ানো ভোটাররা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। ঘরের মধ্যে পড়ে ছিল স্বামীর দেহ। কিছুক্ষণ পর মধ্যে পুলিশ এসে স্বামীকে উদ্ধার করে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু তাঁকে বাঁচানো যায়নি। আজও বুথের সামনে দিয়ে গেলে ওই ঘটনা আমাকে নাড়া দেয়। ভোটের কথা শুনলেই আতঙ্কে থাকি। চোখের জল ধরে রাখতে পারি না। আর ভোটও দিতে যাই না। আবারও ভোট এসেছে। আতঙ্কে দিন কাটছে। অভাবের সংসার। দুই মেয়ে অনামিকা আর রিয়া। অনামিকার বিয়ে হয়েছে বাবা থাকতেই। রিয়ার বিয়ে হয়েছে বছরখানেক আগে। স্বামীর মৃত্যুর পর একাধিক মন্ত্রী-নেতা বাড়িতে এসেছেন। ছোট মেয়ে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ২০১৮ সালেই। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও চাকরি হয়নি। স্বামীর মৃত্যুর পর সুগার, ডায়াবেটিস সহ একাধিক রোগে আক্রান্ত। দুই জামাই আমাকে দেখে বলে বেঁচে আছি। তবে বাড়িতে একা থাকতে হয়। তাই স্বামীর স্মৃতি সবসময় মনে পড়ে।

একই ছবি লতিফা বেওয়ার ক্ষেত্রেও। ইটাহার থানার গুলন্দর গ্রাম পঞ্চায়েতের বড়বিল্লার বাসিন্দা আবদুল আজিজের স্ত্রী। পঞ্চায়েত ভোটে গণ্ডগোলের খবর শুনে বড়বিল্লা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বুথে গিয়েছিলেন ভোটের লাইনে দাঁড়ানো ছেলে আখতার হোসেনকে ঘরে ফিরিয়ে আনতে। পরিবারের সবাই সিপিআই সমর্থক। তৃণমূলের দুষ্কৃতীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে বুথের ভেতরেই খুন করে আবদুল আজিজকে। লতিফাদেবীর কথায়,স্বামী গিয়েছিলেন ছেলেকে বাঁচাতে। তিনিই বাঁচতে পারলেন না। রাজ্যের মন্ত্রী তথা সিপিআই নেতা শ্রীকুমার মুখার্জির খুব কাছের মানুষ ছিলেন স্বামী। সেই কারণেই তাঁকে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীদের হাতে খুন হতে হয়। ঘটনার পর থেকে কেউ আর খোঁজ রাখেনি। বুথের পাশ দিয়ে গেলে ভয় হয়। তবুও প্রয়াত স্বামীর কথা মনে রেখে এখনও ভোট দিতে যাই। এবারও যাব। এখনও পর্যন্ত মূল অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হয়নি। অভিযুক্তদের কেউ হয়েছেন বিধায়ক, কেউ আবার হয়েছেন জেলা পরিষদের সদস্য। তাদের জন্যই আমার স্বামীকে অকালে প্রাণ দিতে হল। আল্লা এর সঠিক বিচার করবেন।

আতঙ্কিত ফিরোজা বেগম, গোলাম মর্তুজা, রফিকুল আলি, আবদুর রহমান, আক্তারা বেগমরাও। এই হতদরিদ্র পরিবারগুলির সদস্যদের বক্তব্য, ভোট চলাকালীন বুথের ভিতরেই আবদুল আজিজকে খুন হতে হয়েছিল। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে সমস্ত বুথ দখল করে ছাপ্পা ভোট হয়েছে। বোমা মেরে স্কুলই উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কালো ধোঁয়া গ্রাস করেছিল শিক্ষার মন্দির। আজও ভয় হয়। আতঙ্কে থাকতে হয়। ভোট দিতে পারব তো? কেন্দ্রীয় বাহিনী, প্রচুর পুলিশ থাকলে তবেই ওই বুথে ভোট দিতে যাব, জানালেন ষাটোর্ধ্ব রেজাউল হক। সময় বদলেছে। নতুন রং-এর প্রলেপে ঢাকা পড়েছে বোমার কালো দাগ। গড়ে উঠেছে নতুন ভবন। তবে এসব দিয়ে ভোটের দিন সন্ত্রাস আটকানো যাবে কি? প্রশ্ন ঘুরছে স্থানীয়দের মনে।