অসচেতনতা এবং নির্লজ্জ ভোটবুভুক্ষু রাজনীতি

443

করোনা ভাইরাস আমাদের কেড়েছে অনেক কিছুস্বাভাবিক জীবন, জীবিকা, আর্থিক প্রগতি, শিল্পবিকাশ ইত্যাদি কেড়ে নিয়েছে ভাইরাসটির সর্বনাশা সংক্রমণপাশাপাশি কেড়েছে মানবিকতা, সংবেদনশীলতানাহলে একটি দেহের সৎকারে কেউ বাধা দিতে পারে? আসলে ভোটের অঙ্কে করণীয় বিচার করা হচ্ছেলিখেছেন গৌতম সরকার

সচেতনতার অভাব নাকি ফাজলামি? আলিপুরদুয়ারের যুবকটির দেহ নিয়ে দুদিনের নাটক দেখে একথা মনে হওয়া স্বাভাবিক। কোভিড হাসপাতালে মৃত্যুটাই যেন অপরাধ হল ওই যুবকের। সেই অপরাধের বোঝা বইতে হল তাঁর পরিবারকে। বাড়ির কাছে দুটি শ্মশানের কোনওটিতেই যুবকের দেহ দাহ করা গেল না। কোভিড হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে বটে, কিন্তু যুবকের করোনা টেস্টের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছিল। পজিটিভ এলে যে দেহ পরিবারের হাতে যেত না, এই বোধটাই যেন আলিপুরদুয়ারের কারও ছিল না। হ্যাঁ, কারও শব্দটাই বলছি অত্যন্ত সচেতনভাবে। অসচেতনতা বলুন আর ফাজলামি বলুন, এর প্রতিকার করতে কাউকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। নিদেনপক্ষে এই অসভ্যতার প্রতিবাদও কেউ করেননি। সাধারণ মানুষের কথা ছেড়েই দিলাম, রাজনৈতিক দল, প্রশাসনও কোনও পদক্ষেপ করেনি। টেলিভিশনের পর্দায় মৃতের বৃদ্ধা মা-কে ছেলের জন্য কবর খুঁড়তে দেখেও বিন্দুমাত্র সহানুভূতি তৈরি হয়নি কারও মধ্যে।

- Advertisement -

হাওড়ার বালিতেও নির্মমতার শেষ ছিল না। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে মৃত প্রৌঢ়ার দেহ ফিরিয়ে আনার পর আবাসনে ঢোকাতেই দেওয়া হল না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেহ পড়ে থাকল আবাসনের প্রবেশপথের বাইরে। অথচ এই প্রৌঢ়ারও করোনা সংক্রমণের কোনও তথ্য নেই। আচমকা শরীর খারাপ হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। একটি মৃতদেহের সঙ্গে এমন আচরণের চেয়ে অমানবিক আর কী হতে পারে। পাড়া-প্রতিবেশী, একই আবাসনের বাসিন্দারা তো বটেই, রাস্তার উলটো দিকে বসবাস করলেও মৃতার পরিবারের আত্মীয়রাও দরজা বন্ধ করে রেখেছিলেন। দেহের সৎকারের জন্য এগিয়ে আসেননি কেউ। বালিতে তাও শেষর্যন্ত স্থানীয় বিদায়ি কাউন্সিলার এসে সৎকারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আলিপুরদুয়ারে কোনও জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক নেতা এগিয়ে আসেননি। তাঁদের নাকি উপলব্ধি ছিল, পরিবারটির পাশে দাঁড়ালে এলাকায় দলের সমর্থন কমে যেতে পারে।

মৃতের পরিবারের অসহায়তা বিন্দুমাত্র রেখাপাত করেনি রাজনৈতিক নেতাদের মনে। করোনা ভাইরাস আমাদের কেড়েছে অনেক কিছু। স্বাভাবিক জীবন, জীবিকা, আর্থিক প্রগতি, শিল্পবিকাশ ইত্যাদি কেড়ে নিয়েছে ভাইরাসটির সর্বনাশা সংক্রমণ। পাশাপাশি কেড়েছে মানবিকতা, সংবেদনশীলতা। নাহলে একটি দেহের সৎকারে কেউ বাধা দিতে পারে? আসলে ভোটের অঙ্কে করণীয় বিচার করা হচ্ছে। করোনা সংক্রামিত না হলে বাড়িতে তাঁর দেহ নিয়ে যাওয়া মৃতের অধিকারের মধ্যে পড়ে। আলিপুরদুয়ারের মৃতের ক্ষেত্রে দূরের শ্মশান তো বটেই, নিজের গ্রামেও যুবকটির দেহ দাহ করতে দেওয়া হয়নি। প্রতিবেশীরা মুখ ফিরিয়েছেন। বাধা দিয়েছেন তাঁরাও। নানা উপসর্গ থাকায় আলিপুরদুয়ারের ওই যুবকটিকে জেলার একমাত্র কোভিড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। যুবকটি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। কিন্তু স্বাস্থ্যদপ্তর জানায়, যুবকের করোনা পরীক্ষার ফল নেগেটিভ। সেকারণে দেহ সৎকারের দাযিত্ব পুলিশকে দেওয়া হয়নি। দেহ তুলে দেওয়া হয় পরিবারের হাতে। কিছু লোকের ফাজলামো শুরু হয় এরপর থেকে। আলিপুরদুয়ার শহরের পূর্বপ্রান্তে বৈদু্য়তিক চুল্লিতে দাহ করা সম্ভব হয়নি স্থানীয় কিছু বাসিন্দার বাধায়। এরপর গ্রামে বাড়ির কাছে নদীর পাড়ে শ্মশানে দেহ নিয়ে যায় যুবকের পরিবার। সেখানেও সৎকার সম্ভব হয়নি এলাকার বাসিন্দারা প্রতিরোধ তৈরি করায়। সারাদিন ধরে এই নাটক চললেও প্রশাসন সুরাহা করার ব্যবস্থা নেয়নি। পুলিশ সব জানলেও শুধু দর্শকের ভূমিকায় ছিল। কোনওভাবে পরিবারটি সৎকার করতে না পারার পর পুলিশ গিয়ে দেহ তুলে এনে হাসপাতালের মর্গে রাখার ব্যবস্থা করে দায় সেরেছে মাত্র। রাজনৈতিক দল মাত্রই সবসময় দাবি করে, তারা মানুষের পাশে থাকে। সেদিন কিন্তু মৃতের পরিবারের অসহায়তা বুঝেও কোনও নেতাকে দেখা যায়নি। আজকাল মৃতদেহ নিয়ে প্রায়ই রাজনীতি হয়। অনেক সময় মৃতকে দলের লোক দাবি করে চলে রাজনৈতিক কর্মসূচি, যা লাশের রাজনীতি নামে এখন পরিচিত।

সেই রাজনীতিও যে সর্বক্ষেত্রে করা হয় না, তা আলিপুরদুয়ার দেখাল। দেখিয়েছে বালি, গড়িয়া, ভাটপাড়া, আরও অনেক এলাকা। এমনকি, আলিপুরদুয়ারের শালকুমারহাটও। করোনা সংক্রমণে মৃতদেহের সৎকারে বাধা দেওয়া হয়েছে রাজ্যের অনেক এলাকায়। যথাযথ বন্দোবস্ত থাকলে করোনায় মৃতের দেহ সৎকার থেকে যে সংক্রমণ ছড়ায় না, তা বারবার বিশেষজ্ঞরা বোঝালেও একদল লোক উন্মত্তের মতো আচরণ করেছেন। কেউ ভেবে দেখার চেষ্টাও করেননি যে সৎকার করতে না দিলে দেহগুলির গতি কী হবে? আমাদের কারও পরিবারে যদি এমন দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে, তাহলে আমরাও কি সৎকারে বাধা দেব? গড়িয়ায় দেহের প্রতি অমানবিক আচরণকে নিন্দা করার কোনও ভাষা নেই। যেভাবে আঁকশি দিয়ে টেনে দেহ তোলা হয়েছে, তার চেয়ে বর্বরোচিত কাজ আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু করোনায় মৃত বলে দেহ দাহ করতে বাধা দেওয়ার মধ্যে আর যাই হোক, কোনও বৈজ্ঞানিক ধারণা নেই। এই বাধাদানও সমানভাবে নিন্দার যোগ্য।

আলিপুরদুয়ারের ক্ষেত্রে শুনেছি, শাসকদলের নেতাদের আশঙ্কা ছিল, স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধাদানে বিরোধিতা করলে দলের ক্ষতি হবে। ক্ষতি মানে সেই এলাকায় দল সমর্থন হারাতে পারে। ভোট কমবে। তাই কেউ মৃতের পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর ঝুঁকি নেননি। এলাকাবাসীকে সচেতন করার পদক্ষেপ তো দূরের কথা। ভোটের অঙ্কের কাছে হেরে গিয়েছে মানবিকতা, সংবেদনশীলতা, বিজ্ঞান, সচেতনতা। মানুষকে সচেতন করার থেকে বেশি অগ্রাধিকার পেয়েছে ভোট সুরক্ষিত রাখার তাগিদ। মানুষকে সচেতন করার দায়িত্ব কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলিরও। প্রতিপক্ষের বিরোধিতায় মানুষকে সচেতন করার কথা বলে থাকে রাজনৈতিক দলগুলি। সতর্ক করে বিরোধী দলের কাজকর্ম, নীতি ইত্যাদির অসারতা তুলে ধরে। কিন্তু যখন বিজ্ঞানচেতনার প্রশ্ন এল, তখন ভোটের অঙ্ক কষতে বসলেন রাজনৈতিক নেতারা। যখন মানবধর্ম পালনের প্রশ্ন সামনে এল, তখন তাঁদের কাছে অগ্রাধিকার পেল দলীয় স্বার্থ।