ব্যবসার জন্য ঋণ নিতে গিয়ে দালালদের ফাঁদে বেকাররা

380

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : প্রধানমন্ত্রী থেকে মুখ্যমন্ত্রী। বেকারদের স্বনির্ভর হতে কেউ পকোড়া ভাজার পরামর্শ দিয়েছেন, তো কেউ চায়ের দোকান খোলার। কিন্তু ব্যবসা করতে হলে পুঁজির দরকার। চাকরি না পেয়ে হতাশ বেকার যুবক-যুবতীরা ঋণ নেওয়ার জন্য ব্যাংকে যাছেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রতারকদের খপ্পরে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। ঋণ পাইয়ে দেওয়ার নামে দেশজুড়ে সক্রিয় একাধিক প্রতারণাচক্র। অনলাইন ঋণের ক্ষেত্রে প্রতারকের সংখ্যা সবথেকে বেশি। তবে যাঁদের উল্লেখযোগ্য শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই বা নিরক্ষর তাঁরাই যে শুধু ব্যাংকে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন তা নয়, শিক্ষিত বেকাররাও ব্যাংক ঋণ নিতে গিয়ে দালালদের ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হচ্ছেন।

বেকারদের স্বনির্ভর করতে বিভিন্ন প্রকল্পে ভরতুকি ঋণ দেয় রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার। টেবিলের নীচ দিয়ে আদানপ্রদান না হলে সেই ঋণ পাওয়া যে বাস্তবে সম্ভব নয়, তা সকলের জানা। ব্যাংকের ঋণ পেতে হলেও এখন দালালদের পকেটে আগাম টাকা গুঁজে দিতে হয়। এ তো গেল সরকারি প্রকল্পের ঋণের কথা। ব্যক্তিগত ঋণ, বন্ধকি ঋণ বা বাড়ি তৈরির ঋণের জন্যও ভরসা সেই দালালরাই। সরকারি বা বেসরকারি ব্যাংককর্মীদের একটা বড় অংশ প্রতারণাচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও অভিযোগের কথা স্বীকার করতে চাইছেন না স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার উত্তরবঙ্গের রিজিওনাল ম্যানেজার (ফিনান্সিয়াল ইনক্লুশন অ্যান্ড মাইক্রো মার্কেট) সঞ্জীব রায়। তিনি বলেন, তদন্ত করার জন্য আমাদের নিজস্ব বিভাগ আছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়লে সেই বিভাগ দ্রুত পদক্ষেপ করছে।

- Advertisement -

সেন্ট্রাল ক্রাইম ব্রাঞ্চের অ্যান্টি ব্যাংক ফ্রড শাখা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত শেষ তিন বছরে দেশে ২৩১৩টি অনলাইন ঋণ প্রতারণার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে ব্যাংকের প্রতিনিধি সেজে ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেজের মাধ্যমে ঋণ পেতে আগ্রহী ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে তাঁর কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ, প্রসেসিং ফি সহ নানা অছিলায় মোটা টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারকদল। অনেক ক্ষেত্রে আবার যত টাকা ঋণ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেই পরিমাণের নির্দিষ্ট শতাংশের হারে আগাম টাকা নিয়ে নিয়েছে প্রতারকরা।

এই অনলাইন প্রতারণাচক্র শুধু রাজ্য বা উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে সক্রিয় তা কিন্তু নয়। এক রাজ্যে বসে অন্য রাজ্যেও কারবার চালাচ্ছে তারা।  চলতি বছর ৬ ফেব্রুয়ারি অ্যান্টি ব্যাংক ফ্রড শাখা, অনলাইনে ঋণ দেওয়ার নামে টাকা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে চেন্নাই থেকে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি হরিয়ানার আম্বালা পুলিশ আগাম ২০ হাজার টাকা নিয়ে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার নামে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোয়েম্বাটুর শহরের অপরাধ দমন শাখা প্রতারণাচক্রের এক মহিলা সহ চার ব্যক্তিকে  গ্রেপ্তার করে। তারা ভুয়ো নথি জমা দিয়ে পাঁচটি ব্যাংক থেকে বাড়ি তৈরির জন্য প্রায় দুকোটি টাকা ঋণ তোলার চেষ্টা করেছিল।

কলকাতা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঋণ প্রতারণার ক্ষেত্রে প্রতারকদল এক ধরনের বিশেষ কলম ব্যবহার করছে। যে কলমের কালি লেখার কিছুক্ষণ পর সহজেই মুছে ফেলা যায়। আবেদনকারীকে ডেকে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর করানোর পাশাপাশি তাঁকে ১০০-২৫০ টাকার একটি ক্যানসেল চেক দিতে বলা হচ্ছে। খুবই কম টাকার চেক হওয়ায় আবেদনকারীরও সন্দেহ হচ্ছে না। চেক লেখার সময় কায়দা করে সেই বিশেষ কলম ব্যবহার করতে দিচ্ছে প্রতারকরা। পরে টাকার পরিমাণ মুছে দিয়ে সেখানে নিজেদের ইচ্ছেমতো অঙ্ক বসিয়ে টাকা তুলে নিচ্ছে প্রতারকরা। চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে একটি প্রতারণাচক্রের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে জেরার পর ওই কলম ব্যবহারের কথা জানতে পারে মুম্বই পুলিশ। চলতি বছর ১৯ ফেব্রুয়ারি ব্যাংক প্রতারণাচক্রের তিন শাগরেদকে গ্রেপ্তার করে কলকাতা পুলিশ। তাদের দুজন গড়ফা এবং একজন যাদবপুর রেল কলোনির বাসিন্দা। ওই চক্রটিও বিশেষ ধরনের কলম ব্যবহার করে দ্রুত ব্যাংক ঋণ পাইয়ে দেওয়ার নামে কয়েক লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল বলে জানতে পারে পুলিশ।

প্রতারণার নানা ফাঁদ পেতে রেখেছে কারবারিরা। ঋণ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা গ্রহীতার আধার কার্ড, প্যান কার্ড সহ যাবতীয় পরিচয়পত্র, ট্যাক্সের কাগজ সহ নানা নথি সংগ্রহ করছে। তারপর ঋণ প্রদানের ফর্মে স্বাক্ষর করিয়ে সার্চিং চার্জের নামে নির্দিষ্ট টাকাও নিয়ে নিচ্ছে। পরবর্তী সময় বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে আবেদনকারীকে বলা হচ্ছে তাঁর আবেদন বাতিল হয়ে গিয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নথিপত্র ফেরত দেওয়া নিয়ে টালবাহানা করা হচ্ছে। সেইসব নথি ব্যবহার করে চক্রের কারবারিরা পরে ঋণ তুলে নিচ্ছে। অথচ যাঁর নামে ঋণ উঠছে তিনি জানতেই পারছেন না। পরে ইএমআই-এর টাকা জমা না পড়ায় যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ব্যাংক থেকে নোটিশ আসছে তখন বুঝতে পারছেন যে তিনি প্রতারিত হয়েছেন। এই ধরনের একাধিক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে।

শিলিগুড়ির প্রধাননগরের যুবক সুরজ সুব্বা ঋণ জালিয়াতির ফাঁদে পড়েছিলেন। তিনি বলেন, রেস্তোরাঁ খোলার জন্য একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে গিয়েছিলাম। সমস্ত প্রক্রিয়া মেনে আবেদনের পর প্রায় সাত মাস ঘুরলেও ঋণ মেলেনি। পরে একটি দালালচক্রের খপ্পরে পড়ি। তারা দুই সপ্তাহে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সার্ভিস চার্জের নামে ১৫ হাজার টাকা নিয়েছিল। পরে আর তাদের খোঁজ পাইনি।

অনলাইনে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার নামে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ফোন করে আবেদনের কথা বলছে প্রতারকরা। বলা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে পূর্ব অনুমোদিত ঋণ আছে। কখনও বলা হচ্ছে, সেই ঋণ পেতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আবেদন করতে হবে। কখনও বলা হচ্ছে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আবেদন করলে ঋণ পাওয়া যাবে। আবেদন করলেই সার্ভিস চার্জ, প্রসেসিং ফি বাবদ নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দিতে বলা হচ্ছে সুনির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে। টাকা জমা পড়ার পর আবেদনকারীকে যেসব নম্বর থেকে ফোন করা হয়েছিল, সেগুলিতে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

২০১৮-র এপ্রিল মাসে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার নামে কোচবিহার শহরে অবস্থিত একটি বেসরকারি ব্যাংকের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগ ওঠে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, তুফানগঞ্জ ও মাথাভাঙ্গার বেশ কয়েকজনের কাছে ব্যক্তিগত ঋণ পাইয়ে দেওয়ার নামে ঋণের পরিমাণের ১০ শতাংশ হিসাবে আগাম টাকা নেয় চক্রটি। কারও কাছে ১০ হাজার, কারও কাছে ১৫ হাজার করে লক্ষাধিক টাকা তুলে চম্পট দেয় চক্রটি। ভুয়ো নথি ব্যবহার করে শিলিগুড়ির সেবক রোডের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ৩ কোটি ৯৫ লক্ষ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছিল। বছর দুয়েক আগের সেই ঘটনায় ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিহারের পাটলিপুত্র পুলিশ স্টেশন এলাকা থেকে প্রতারণাচক্রের মাথাকে গ্রেপ্তার করে শিলিগুড়ি পুলিশ। সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, ৪ কোটি টাকারও বেশি ঋণ প্রতারণার একটি বড় চক্রের সন্ধানে ২০১৮ সালের মার্চ মাসে একই সঙ্গে কোচবিহার, দার্জিলিং, বর্ধমান, কলকাতার বেশ কয়েটি এলাকা, বিহারের হাজিপুর এবং সিকিমের পেলিংয়ে অভিযান চালিয়ে বহু নথিপত্র উদ্ধার করে সিবিআই।