জিএসটি-র নামে টাকা নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা

799

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : মনে করুন আপনি পুজোর বাজার করতে বেরিয়েছেন। এলাকার নামী দোকান থেকে জামাকাপড় কেনার পর কম্পিউটারে প্রিন্ট করা একটি কাগজ আপনাকে ধরিয়ে দেওয়া হল। তাতে জিনিসের দামের সঙ্গে শতাংশের হারে জিএসটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আপনিও পুরো দাম মিটিয়ে দিয়ে চলে এলেন। বাস্তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপনার দেওয়া জিএসটি জমা পড়ছে না সরকারি কোষাগারে। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জিএসটি-র নামে টাকা আদায় করে তা নিজেদের পকেটে পুরছে। ফলে একদিকে যেমন সাধারণ ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন তেমনই সরকারের কোটি-কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের এই প্রতারণা বন্ধের জন্য কার‌্যত কোনও ব্যবস্থাই বাস্তবে নেই। কোন ব্যবসায়ী জিএসটি নিতে পারেন বা কীভাবে নিতে পারেন, সেটা জানার কোনও সরকারি ব্যবস্থা এখনও তৈরি হয়নি। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রমরমা হয়েছে জিএসটি প্রতারণাচক্র। কেন্দ্রীয় জিএসটির শিলিগুড়ির কমিশনার বিমান তারি বলেন, কোনওভাবেই ট্যাক্স ইনভয়েস ছাড়া জিএসটি নেওয়া যাবে না। সেটা বেআইনি। যদি কোনও ক্রেতাকে সাদা কাগজ বা অন্য কোনও কাগজ দিয়ে জিএসটি নেওয়া হয় তাহলে আমাদের সেটা লিখিতভাবে জানাতে হবে। অভিযোগ পেলে অবশ্যই আইনত পদক্ষেপ করব।

গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স বা জিএসটিতে পণ্য কেনাবেচা এবং পরিষেবা প্রদান- দুটি ক্ষেত্রেই কর আদায়ে কথা বলা হয়েছে। আইন বলছে, পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রে ৪০ লক্ষ টাকা এবং পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনও ব্যবসায়ী বা সংস্থার বার্ষিক টার্নওভার ২০ লক্ষ টাকা হলে সেই সংস্থা বা ব্যবসায়ীকে বাধ্যতামূলকভাবে জিএসটি নম্বর নিতে হবে। এক রাজ্যের ব্যবসায়ী অন্য রাজ্যে পণ্য কেনাবেচা বা পরিষেবা প্রদান করলেও তাঁকেও বাধ্যমূলকভাবে জিএসটি নম্বর নিতে হবে। তবে টার্নওভারের বাধ্যবাধকতা ছাড়াও কোনও ব্যবসায়ী জিএসটি নম্বর নিতে পারেন। জিএসটি নম্বর নেই এমন কোনও ব্যবসায়ী বা সংস্থা গ্রাহক বা ক্রেতার কাছ থেকে জিএসটি বাবদ টাকা আদায় করতে পারবেন না। একইভাবে জিএসটি নম্বর থাকা মানেই কোনও ব্যবসায়ী বা সংস্থা জিএসটি আদায় করতে পারবেন, তেমনটাও নয়। জিএসটি নম্বরধারী ব্যবসায়ীদের রেগুলার ডিলার এবং কম্পোজিট ডিলার এই দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। পরিষেবা প্রদানকারী যেসব সংস্থা বা ব্যবসায়ী বাধ্যতামূলকভাবে জিএসটি নম্বর নিয়েছেন তাঁরা সকলেই রেগুলার ডিলার। পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রে যাঁদের বার্ষিক টার্নওভার দেড় কোটি টাকার বেশি, আইনের চোখে তাঁরাও রেগুলার ডিলার হিসাবে চিহ্নিত হবেন। যদি কোনও ব্যবসায়ী পণ্য কেনাবেচার সঙ্গে পরিষেবাও প্রদান করেন এবং তাঁর  মোট বার্ষিক টার্নওভারের পাঁচ শতাংশের বেশি যদি পরিষেবা প্রদান থেকে আসে তাহলেও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী বা সংস্থাকে রেগুলার ডিলার বলা হবে। আবার এইসব শর্তের মধ্যে না পড়লেও যে কোনও ব্যবসায়ী নিজেদের রেগুলার ডিলার হিসাবে নথিভুক্ত করতে পারেন। তবে আয়কর দপ্তরের আধিকারিকদের একাংশ বলছেন, শর্তের মধ্যে না পড়লে সাধারণত কোনও ব্যবসায়ী যেচে নিজেদের রেগুলার ডিলার হিসাবে নথিভুক্ত করেন না।

- Advertisement -

এই ক্যাটিগোরির বাইরের ব্যবসায়ীরাই কম্পোজিট ডিলার। আয়কর দপ্তরের কর্তারা জানিয়েছেন, একমাত্র রেগুলার ডিলাররাই গ্রাহক বা ক্রেতার কাছ থেকে জিএসটি বাবদ টাকা নিতে পারবেন। সেই টাকা নেওয়ার ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট নিয়ম বলে দিয়েছে অর্থমন্ত্রক। রেগুলার ডিলার জিএসটি সহ দাম নেওয়ার ক্ষেত্রে ক্রেতাকে যে কাগজ দেবেন সেটার নাম ট্যাক্স ইনভয়েস। ইনভয়েস লেখা কোনও কাগজে শুধু পণ্যের নাম ও দাম লিখে দিলেই জিএসটি নেওয়া যাবে না। যদি সেভাবে কেউ জিএসটি আদায় করে তাহলে সেখানে গরমিল আছে বলেই জানিয়েছেন আয়কর দপ্তরের কর্তারা। ইনভয়েসে কোন কোন তথ্য থাকবে সুনির্দিষ্টভাবে সেটাও উল্লেখ করেছে অর্থমন্ত্রক। কম্পোজিট ডিলার ক্রেতাকে দামের যে রসিদ দেবেন সেটার নাম বিল অফ সাপ্লাই। জিএসটি আইন অনুসারে, বিল অফ সাপ্লাইয়ে ব্যবসায়ীকে লিখে দিতে হবে তিনি আইনত কোনও প্রকার জিএসটি সংগ্রহ করতে পারেন না। বিশিষ্ট কর আইনজীবী সঞ্জীব চক্রবর্তী বলেন, কে রেগুলার ডিলার, কে কম্পোজিট ডিলার সেই সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের জটিলতা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কোনওভাবেই সম্ভব নয়। জিএসটি-র নামে সাধারণ মানুষ যাতে প্রতারিত না হন সেটা সুনিশ্চিত করার দাযিত্ব অর্থমন্ত্রকের। কিন্তু মন্ত্রক এবং জিএসটি বিভাগ এইসব নিয়ে একেবারেই নীরব। অথচ নিয়মানুসারে ট্যাক্স ইনভয়েস না দেওয়া বা ভুয়ো বা ভুল ইনভয়েস দেওয়ার জন্য কোনও ব্যবসায়ী বা সংস্থার ১০ হাজার টাকা জরিমানা ও একাধিক অভিযোগ জমা পড়লে কারাবাসের বিধান রয়েছে।

প্রতারণাচক্রের হাত থেকে বাঁচতে ক্রেতাদের সতর্ক থাকার অনুরোধ করেছেন সিআইআই-এর কর্তারা। সংগঠনের উত্তরবঙ্গ আঞ্চলিক কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সঞ্জয় টিব্রুয়াল বলেন, ক্রেতাদের পাকা বিল না নেওয়ার সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। বিক্রেতাদের কোনও অজুহাত না শুনে ক্রেতারা নিয়ম মেনে সঠিক বিল নিলেই প্রতারণা বন্ধ হয়ে যাবে। ইস্টার্ন এবিসি চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ-এর আহ্বায়ক সুরজিৎ পাল বলেন, সাদা কাগজে বা ট্যাক্স ইনভয়েস ছাড়া জিএসটির নামে টাকা আদায় মারাত্মক অপরাধ। ক্রেতাদেরই এই বিষয়ে সবার আগে এগিয়ে এসে অভিযোগ করতে হবে। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে জিএসটি বিভাগকেও পদক্ষেপ করতে হবে।