সরকারি করের দাপটে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি পেট্রোল-ডিজেলের

168

নয়াদিল্লি : কৃষক আন্দোলন আর করোনা টিকাকরণ। গণমাধ্যমে চর্চার বিষয় আপাতত দ্বিমুখী। এর পাশাপাশি সামাজিক পরিসরে মধ্যবিত্তের কাছে প্রধান মাথাব্যথার বিষয় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। ভারতে রেকর্ড গড়ে ফেলেছে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম। প্রায় প্রতিদিনই পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ছে। রাজস্থানে পেট্রোলের দাম ১০০ টাকা ছুঁইছুঁই। সব রাজ্যেই তেলের খুচরো মূল্যের সঙ্গে কর যুক্ত রয়েছে। এদেশে খনিজ তেলের মূল্যবৃদ্ধির যুক্তি বহু পুরোনো। বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে এখানেও তার প্রভাব পড়ে। তেল সংস্থাগুলির পক্ষে ভরতুকি দিয়ে পেট্রোল-ডিজেল বিক্রি করা সম্ভব নয়। একই যুক্তিতে বছরকয়েক আগে তেলের দামের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হয়েছে। যদিও এর খুচরো মূল্যের বড় অংশ কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের চাপানো কর। দিল্লিতে এক লিটার পেট্রোল যে দামে বিকোয় তার ৬২ শতাংশ কর বাবদ সরকারি কোষাগারে জমা হয়। ডিজেলের ক্ষেত্রে করের পরিমাণ ৫৭ শতাংশ।
খনিজ তেলের দাম নিয়ে সরকার নীরব। বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৫৫ ডলারের আশপাশে ছিল। কয়েক সপ্তাহ ধরে যা ক্রমশ চড়ছে। সৌদি আরব একতরফা উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার ফলে এই মূল্যবৃদ্ধি বলে মনে করা হচ্ছে। এর জেরে ভারতে পেট্রোলের দাম রেকর্ড ছুঁয়েছে। এর আগে ২০১৮-র অক্টোবরে তেলের দাম এতটাই বেড়েছিল। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ৮০ ডলার। প্রশ্ন উঠবে ২৭ মাসের ফারাকে ব্যারেল প্রতি তেলের দাম প্রায় ২৫ ডলার কম হলেও খোলা বাজারে তা প্রায় ২০১৮-র দামে বিকোচ্ছে কেন? কারণ একটাই, ভারতে পেট্রোপণ্যে অন্তঃশুল্ক বৃদ্ধি। শুধু ২০১৯ সালে পেট্রোলের ওপর কেন্দ্রীয় করের পরিমাণ ১৯.৯৮ টাকা থেকে বেড়ে ৩২.৯৮ টাকা হয়েছিল। ওই সময় ডিজেলে করের পরিমাণ ৩১.৪৩ টাকা হয়। যা আগে ১৫.৮৩ টাকা ছিল। এর সঙ্গে রাজ্য সরকারের কর যুক্ত করলে অঙ্কটা আরও বাড়বে।
করোনা লকডাউন চালাকালীনও জ্বালানি তেলে কর চাপানো হয়। চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ৮ মাসে তেল থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের উৎপাদন শুল্ক আদায় বেড়েছে ৪৮ শতাংশ। যদিও তখন তেলের বিক্রি অনেক কম ছিল। সহজ কথায়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি করের পরিমাণ না কমায় ভারতে তেলের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। একদিন পরে বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। লকডাউনের জেরে এবার সরকারের রাজস্ব আদায় বড় রকম ধাক্কা খেয়েছে। বাজেট ঘাটতি ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আপাতত পেট্রোপণ্যের ওপর কর কমার আশা নেই বললে চলে। স্বাভাবিকভাবে পরিবহণের খরচ আরও বাড়তে চলেছে। যার প্রভাব সরাসরি মূল্যবৃদ্ধির ওপর পড়বে।
তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে ২টি বিকল্পের কথা জানান অল ইন্ডিয়া মোটর ট্রান্সপোর্ট কংগ্রেসের সভাপতি কুলত্রাণ সিং। তাঁর মতে, দাম কমাতে হলে অন্তঃশুল্ক কমানো প্রয়োজন। নয়তো জ্বালানি তেলকে জিএসটির আওতায় আনতে হবে। সেক্ষেত্রে এর ওপর ভ্যাট ও অন্তঃশুল্ক বসবে না। সরকার যে-কোনো একটি পথ অনুসরণ না করলে অদূর ভবিষ্যতে পেট্রোল-ডিজেলের দাম আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন তিনি। মহারাষ্ট্র স্টেট বাহনচালক প্রতিনিধি সংগঠনের সভাপতি বাবা সিন্ধের বক্তব্য, লকডাউনের সময় পরিবহণ শিল্প স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। বর্তমানে মাত্র ৭০ শতাংশ গাড়ি রাস্তায় নেমেছে। তেলের দাম বাড়ায় পরিবহণের খরচ বেড়েছে, যা পণ্য পরিবহণে বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে মত সিন্ধের। ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণ পরিবহণের মাধ্যমে পণ্য নিয়ে যাওয়া বন্ধ করতে পদক্ষেপের দাবি করেছে একাধিক ট্রাক সংগঠন। তবে আসন্ন বাজেটে পেট্রোপণ্যে কর কমাতে পদক্ষেপ করা হবে কিনা সেব্যাপারে এখনও মৌন অর্থমন্ত্রক।