আদিবাসী মেয়েদের স্বনির্ভর করছেন উপেন

কলকাতা : ঘন জঙ্গলের মধ্যে বিউটি পার্লার। একটি লম্বা তাল গাছের গায়ে ভাঙাচোরা মাটির কুটিরের দরজায় লটকানো জং ধরা টিনের বোর্ডে বিউটি পার্লর লেখা দেখে চোখ ছানাবড়া হওয়ার জোগাড় প্রাক্তন দুঁদে গোয়েন্দার। বাগদার মতো পিছিয়ে পড়া একটি এলাকায় বনের মধ্যে কে খুলেছে এই বিউটি পার্লার? নুন আনতে যাঁদের পান্তা ফুরোয়, তাঁদের কেউ কি আদৌ এখানে আসে রূপচর্চা করতে? কুঁড়েঘরের বাসিন্দাদের সম্পর্কে জানার কৌতূহল হয় প্রাক্তন দুঁদে গোয়েন্দা উপেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের। আদিবাসী মহল্লায় বিউটি পার্লার খোলার রহস্য সম্পর্কে জানতে মন চায়।

এর কয়েকদিন বাদে সস্ত্রীক উপেনবাবু আদিবাসী গ্রামে যান সভা করতে। সভা চলাকালীন তাঁর স্ত্রী বলেন, খেয়াল করেছ, আদিবাসী মেয়েরা সবাই বেশ সেজেগুজে এসেছে? তাই তো, চমকে ওঠেন উপেনবাবু। সেদিন বনের মধ্যে দেখা বিউটি পার্লারের রহস্য ফাঁস হয়ে যায় তাঁর কাছে। সোশ্যাল অ্যান্থ্রোপলজি নিয়ে পড়াশোনা উপেনবাবুর। তিনি জানেন, আদিবাসীরা গরিব হলেও অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন স্বভাবের। ঘরের কোণে সামান্য নোংরাও তাঁরা জমতে দেয় না। সংগতি যৎসামান্য হলেও নিজস্ব ঘরানায় পরিপাটি করে সাজতে ভালোবাসে আদিবাসী মেয়েরা। চোখ খুলে যায় উপেনবাবুর। আদিবাসী উন্নয়নের একটি রাস্তা তিনি দেখতে পান।

- Advertisement -

উপেনবাবু বলছিলেন, সেদিনই ঠিক করে ফেললাম আদিবাসী মেয়েদের বিউটিশিয়ান বানাব। শানওয়াজ হুসেন, ফ্লোরা সিং ও অন্যদের নিয়ে কাজ শুরু হয়ে গেল। এটা ২০১২ সালের ঘটনা। সেদিন থেকে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বাংলার ৩০ হাজার গ্রামের বাছাই করা ২৭,৮০০ আদিবাসী মহিলাকে এথনিক বিউটি কেয়ার-এর তালিম দিয়ে উপার্জনক্ষম করে তুলেছেন উপেনবাবুরা।

ছিলেন সিবিআই অফিসার। ২০০২ সালে পশুখাদ্য কেলেঙ্কারিতে বিহারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদবকে জেলে পাঠিয়ে শিরোনামে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অতিরিক্ত অধিকর্তা উপেন বিশ্বাস। অবসরের পর তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়ে বাগদা থেকে বিধায়ক হয়ে রাজ্যের তপশিলি জাতি ও উপজাতি কল্যাণ মন্ত্রী হন। কাজ শুরু করেন আদিবাসী মহিলাদের নিয়ে। পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর মেয়েদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করার পাশাপাশি আরও একটি উদ্দেশ্য ছিল উপেনবাবুর। জাতি ও উপজাতিগুলির মধ্যে শিকড় গেড়ে থাকা জাতপাত ও কুসংস্কারের প্রভাব কাটানো। তিনি বলছিলেন, বাংলার জনগোষ্ঠীর মধ্যে ২৩.৫১ শতাংশ তপশিলি জাতি এবং ৫.৮৫ শতাংশ তপশিলি উপজাতির মানুষ। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ। রাজ্যের এক-তৃতীযাংশ মানুষ পিছিয়ে থাকলে রাজ্যের উন্নতি হতে পারে না। তাই এঁদের মূলস্রোতে নিয়ে আসার চেষ্টা। আর্থিক স্বনির্ভরতার সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গি পালটানোর ব্যাপারটাতেও জোর দেওয়া হয়েছিল। আদিবাসী মহিলারা যাতে বিউটিশিয়ান হয়ে রোজগার করতে পারেন, সেজন্য এথনিক বিউটিশিয়ানের কোর্স চালু করা হয়। সবচেয়ে বেশি সাড়া মেলে জঙ্গলমহল থেকে। চিন্তা ছিল, প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর তাঁরা কাজ পাবেন কিনা। ভাবনা হল, তথাকথিত উচ্চবর্ণের লোকজন সাজগোজ করতে তপশিলি কোল, ভিল, সাঁওতাল, ওরাওঁ, মুন্ডা মেয়েদের কাছে আসবেন তো? দেখা গেল জাতপাত নয়, পেশার ক্ষেত্রে দক্ষতাই মূল বিচার্য হয়।

উপেনবাবুর দাবি, এই একটি প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রাম বাংলার আদিবাসী মহল্লায় আর্থসামাজিক বিপুল পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে। উপার্জন করার সুযোগ পাওয়ার পর আদিবাসী মহিলাদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামাজিক সম্মানও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। পরিবর্তন হয়েছে তাঁদের ব্যক্তিত্বেও। ওই ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়ছিল প্রাচী নামে একটি আদিবাসী মেয়ের কথাবার্তায়। তাঁর আদি নাম ছিল পাচি। বিউটিশিয়ান কোর্স করার পর শিক্ষকদের অনুরোধে নাম পালটে হন প্রাচী। বললেন, আমার পুনর্জন্ম হয়েছে। কী ছিলাম, কী হয়েছি। কোর্স করার পর নিজের বিউটি পার্লার খুলেছি। মাসে রোজগার ১৪-১৫ হাজার টাকা। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পেরে আমি খুশি। তাছাড়া এলাকায় আমার সম্মানও অনেক বেড়েছে। এখন অনেকেই পরামর্শ, সাহায্য চায়। উপেন স্যারের ঋণ কোনও দিন শোধ হবে না। নদিয়ার হরিণঘাঁটা থেকে শুরু হয়ে রাজ্যের প্রায় প্রতিটি ব্লকে ছড়িয়ে পড়ে স্বনির্ভরতার কর্মসূচি। জাতপাতের বাধা পেরিয়ে আদিবাসী মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছেন, এটা দেখেই খুশি উপেন বিশ্বাস।