বেপরোয়াভাবে মাস্ক ছাড়াই ভিড়, বাড়ছে করোনা সংক্রমণের ভয়

168

নিউজ ব্যুরো : আমজনতার জন্য খোলা বাজারে ভ্যাকসিন এখনও আসেনি। কিন্তু ভ্যাকসিন আবিষ্কারের খবরেই করোনা আতঙ্ককে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন কলকাতা থেকে কুমারগ্রামের মানুষ। বেপরোয়াভাবে মাস্ক ছাড়াই হাট-বাজার, শপিং মল সর্বত্র ভিড় করছেন সকলে। কয়েকটি নামী শপিং মলে দেহের তাপমাত্রা পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও অন্যত্র কোথাও কার্যত কোনও ব্যবস্থাই নেই। ফলে করোনা সংক্রমণের বিধিনিষেধ শিকেয় তুলে বেপরোয়াভাবে ঘুরছেন মানুষজন।

প্রশ্ন উঠছে, মহারাষ্ট্র, কেরলে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পরেও করোনার সংক্রমণ যেভাবে বাড়তে শুরু করেছে তা থেকে এ রাজ্যে সরকার কেন সতর্ক হচ্ছে না? করোনার নতুন স্ট্রেন যে আরও বিপজ্জনক তা জানার পরেও কেন সেইমতো মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করা হচ্ছে না? কোভিড ১৯এর উত্তরবঙ্গের দাযিত্বপ্রাপ্ত অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি (ওএসডি) ডাঃ সুশান্ত রায় বলেন, প্রশাসনের তরফে সবসময় মাস্ক পরা, শারীরিক দূরত্ব মেনে চলার কথা বলা হচ্ছে। মানুষ সচেতন না হলে তো কিছু করার নেই।

- Advertisement -

মহারাষ্ট্রে গত সাতদিন ধরে সংক্রামিতের সংখ্যা হুহু করে বাড়ছে। সেখানেও আমজনতা লাগামছাড়া হয়ে স্বাস্থ্যবিধি শিকেয় তুলে দেওয়ায় এমন পরিণতি হয়েছে। সূত্রের খবর, এই পরিস্থিতিতেও মুম্বইয়ে লোকের মধ্যে সচেতনতা ফেরেনি। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, মুম্বই প্রশাসন ৩০০ মার্শাল নিয়োগ করেছে। ট্রেন বা অন্য গণপরিবহণে মাস্ক না পরে যাতায়াতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন তাঁরা। প্রতিদিন ২৫ হাজার এমন লোকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে তাঁদের। মুম্বই প্রশাসন আরও জানিয়েছে, কোনও বহুতলে পাঁচজন বা তার বেশি সংক্রামিত থাকলেই সেটি সিল করে দেওয়া হবে। হোটেলে ৫০ শতাংশের বেশি লোক রাখা চলবে না। এমন একগুচ্ছ নিয়ম জারি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে সেখানে। কেরলেও পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। গত রবিবার পর্যন্ত পাওয়া হিসাবে, সেখানে সংক্রামিতের সংখ্যা লক্ষাধিক।

দেশের দুই রাজ্যে এমন পরিস্থিতির পরেও পশ্চিমবঙ্গে আমজনতার হুঁশ নেই। এমনকি তাদের কোভিড প্রোটোকল কড়াভাবে মানতে বাধ্য করতেও প্রশাসন ব্যর্থ। ফলে আগামীদিনে করোনার সেকেন্ড ওয়েভ-এর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।  বিশিষ্ট কার্ডিয়াক সার্জন ডাঃ কুণাল সরকার বলেন, ইউরোপের সেকেন্ড ওয়েভটাও খারাপ ছিল। কিন্তু সেখানে এখন কমের দিকে। মহারাষ্ট্র, কেরলে সংক্রমণ ক্রমে বাড়ছে। আমাদের সবাইকে সাবধান হতে হবে। মাস্ক ছাড়া, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে হুল্লোড় করে বেড়ালে সমস্যা হবে। মাস্ক পরার থেকেও বড় কথা হচ্ছে, যে রকম স্লো মোশনে আমরা ভ্যাকসিনেট করছি সেটা আরও একটা বড় বিপদ। যেখানে আমাদের দিনে মিনিমাম ১৪-১৫ লাখ ভ্যাকসিনেট করার কথা, সেখানে আমরা দিনে ৩ লাখ করে করছি। সুতরাং, এমন যেন না হয়, মোটামুটি ভালো খেলেও আমরা সেমসাইড গোলে হেরে গেলাম, এটা কিন্তু খুবই খারাপ হবে। করোনা নিয়ে মানুষ যেমন ঢিলেঢালা, সরকারও তেমন হয়ে গিয়েছে।

ডিসেম্বর মাস থেকেই করোনার সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। দার্জিলিং সহ উত্তরবঙ্গের আট জেলায় কোনওদিন অল্প সংখ্যায় সংক্রমণ থাকছে, কোনওদিন সংক্রমণমুক্ত হচ্ছে। এই সংক্রমণ কমাতেই করোনার সমস্ত বিধিনিষেধ ভুলে আমজনতা মাস্ক পরা, শারীরিক দূরত্ব মানা, হাত ধোওয়া সবকিছু যেন ভুলে গিয়েছে। পাশাপাশি ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হওয়ায় সাধারণের লাগামছাড়া মনোভাব আরও বেড়েছে। কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, এই ডোন্ট কেয়ার মনোভাবটাই আমাদের বিপদ ডেকে আনতে পারে।

উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেস্ট মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডাঃ ইন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, মহারাষ্ট্র, কেরল দেখে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। করোনার সংক্রমণ কমেছে মানেই এই নয় যে, আমরা মাস্ক, স্যানিটাইজার এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা ছেড়ে দেব। কিন্তু মানুষ সেটাই করছেন। মহারাষ্ট্র বা কেরলে নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে। সেটা নতুন স্ট্রেন কি না এখনও চিহ্নিত হয়নি। মুম্বই, কেরল থেকে ভাইরাস আসতে বেশি সময় লাগবে না।মেডিকেলের প্যাথলজি বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসার তথা কোভিড কেয়ার নেটওয়ার্কের কোঅর্ডিনেটর ডাঃ কল্যাণ খান বলেন, করোনা ভাইরাস প্রতিনিয়ত রূপ বদল করছে। এভাবে রূপ বদলাতে বদলাতে আরও মারাত্মক কোনও স্ট্রেন নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু আমরা যদি কোভিড প্রোটোকলগুলো মেনে চলি, অন্তত সঠিকভাবে মাস্ক পরা এবং হাত ধোয়ার কাজ করতে পারি তাহলেও করোনা অনেকটা প্রতিরোধ করা যাবে। যাঁরা ভ্যাকসিন নিচ্ছেন, যাঁরা এখনও নেননি উভয়পক্ষকেই করোনার নিয়মনীতি কঠোরভাবে মানতে হবে। কেননা এই ভ্যাকসিন কতদিন কাজ করবে, কতটা সুরক্ষা দেবে সেসব আমাদের কারও এখনও জানা নেই।

বিশিষ্ট চিকিৎসক তাপস রায় বলেন, যেভাবে সবাই সুরক্ষাবিধি না মেনেই ঘোরাঘুরি করছে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এরাজ্যে সংক্রমণ নিঃসন্দেহে অনেক কমেছে। কিন্তু আরও বেশ কিছুদিন আমাদের মাস্ক পরা সহ সমস্ত সুরক্ষাবিধি মেনে চলতেই হবে। হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হতে আরও ৬ মাস লেগে যাবে। টিকা নিলেও ১২ থেকে ১৪ সপ্তাহ লেগে যায় অ্যান্টিবডি তৈরি হতে। কিন্তু যেভাবে সরস্বতীপুজোর সময় ছেলেমেয়েরা হইহই করে মাস্ক না পরে শারীরিক দূরত্ব না মেনে রাস্তাঘাটে বেরিয়ে পড়ল তাতে আমি আশঙ্কিত।

বিশিষ্ট চিকিৎসক অশোকানন্দ কোনারের মতে, এভাবে চললে এরাজ্যে আবার নতুন করে করোনার ঢেউ আসবে। মুম্বইয়ে পরিস্থিতি দেখে শিক্ষা নেওয়া দরকার। দিল্লির মতো আমাদের এখানে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়নি। ৪০ বছরের নীচের বয়সিদের টিকা পেতে এখনও দেরি আছে। কাজেই এখনই মাস্ক ছুড়ে ফেলার সময় আসেনি।