নির্বাচনি প্রচারে ভাষাসন্ত্রাসে প্রশ্ন, বাঙালি কি আর ভদ্রলোকের জাত

79

সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় : কেন জানি না ফি বছর এই একুশে ফেব্রুয়ারির আগেপিছের সময়টায় কালীপ্রসন্ন সিংহের কথা বড্ড মনে পড়ে। উনিশ শতকের কলকাতা এবং বাঙালির বাবুয়ানির হাড়েমজ্জায় বর্ণনার কথাকার তো তিনিই। বাঙালির অন্তরঙ্গ কথালাপের সোজাসাপটা ও ভণিতাহীন উপস্থিতি হুতোম তথা কালীপ্রসন্ন যেভাবে জাহির করেছেন, এই এত বছর অতিক্রান্ত হয়ে তা রিনরিন করে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গর্বিত উদযাপন কালে প্রতি বছর এই সময়টায় তাই কোথা হইতে আমরা কোথায় আসিয়া পড়িলাম গোছের একটা ভাবনায় আচ্ছন্ন হই।
তবে সেই জন্যই শুধু নয়, এবার, এই ফাল্গুনের সূচনাপর্বেই বঙ্গভূমি যেভাবে চৈত্রের দুপুরের রূপ নিয়ে তেতেপুড়ে উঠেছে, তাতে অজান্তেই ভাষা বিবর্তন নতুনভাবে ভাবনায় ঢুকে যাচ্ছে। ভোটপর্বে বাঙালি কী অবলীলায় ভালোমানুষের পো হয়ে ণত্ব ষত্ব বিধি ভুলে নিজেকে আগলহীন করে তোলে ভাবছি! এই বিস্ময় সমাজপতিদের বলিরেখা গাঢ় করতে পারে কিন্তু সমাজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তারাই যখন সেই লীলায় অবলীলায় গা ভাসান তখন বিস্ময়ে অবধি পর্যন্ত থাকে না! উনিশ শতকের বাবু কালচারের খ্যামটা, খেউড়, খিস্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একুশ শতকের দাদা-দিদিরাও তখন এক-একজন খয়ের খাঁ! কালীপ্রসন্ন আক্ষরিক অর্থেই দীর্ঘজীবী হয়েছেন।

আধুনিক, সভ্য ও বৈষম্যহীন দুনিয়ায় ইদানীং বডি শেমিং শব্দবন্ধের চল খুব। আগেও ছিল। সেই ছেলেবেলাতেই তো পড়েছিলাম, কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া বলতে নেই। তবুও ক্লাসের গোলগাল ছেলেটার ডাকনাম তখন অবধারিতভাবে মোটা হত! রোগা হত খ্যাংরা। লম্বা হত লগা। আজকাল অবিশ্যি বডি শেমিং সমাজের চোখে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বেয়াদবির জন্য কাঠগড়াতেও যেতে হতে পারে। না হলে সোশ্যাল মিডিয়ার তুলোধোনা। কেটেছিঁড়ে বেআব্রু করতে এক মিনিটও লাগবে না।

- Advertisement -

কিন্তু ভোটের বাজারে কে-ই বা কবে সামাজিক বিধান কি রক্তচক্ষুর তোয়াক্কা করেছে? তাই নাড্ডা, ফাড্ডা, চাড্ডা, গাড্ডার পর যখন প্রবল প্রতিপক্ষের অমিতশক্তিধর নম্বর টু-কে বঙ্গের সর্বজনীন জ্যেষ্ঠা ভগিনী তীব্র কটাক্ষে নাদুস-নুদুস, ফানুস-ফানুস, ফাটুস-ফুটুস বলে চিত্রিত করেন, পাবলিক তখন খই ফোটা ফোটে! প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি বলতেন, বক্তৃতা সেটাই যা জনতার রক্ত গরম করে। কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করায়। যতবার এই কথা মনে পড়ে ততবার কেন যেন ভেসে ওঠে আমার দেখা একমাত্র এক বাঙালির মুখ, ভাষাকে হাতিয়ার করে যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়ে বঙ্গবন্ধু নামে অমর হয়ে রয়েছেন।

কালীপ্রসন্নের কল্যাণেই কি না কে জানে, বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধেও বঙ্গ রাজনীতিতে গালমন্দ ও খেউড়ের অবিরাম চর্চা অব্যাহত ছিল। বাঙালিকে যাঁরা ভদ্রলোকের জাত বলে ভাবেন তাঁরা গবেষণা করে দেখতে পারেন ঋষিতুল্য প্রফুল্ল সেনকে তৎকালীন কমিউনিস্টরা কেন চোর অপবাদ দিয়েছিল, অতুল্য ঘোষকে কেন কানা বেগুন বলতে দ্বিধা করেনি! কিংবা তারও আগে, মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায় ও তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হরিহর আত্মা নলিনী সরকারকেও তো ছেড়ে দেয়নি সুশীল বঙ্গসমাজ! খুব সম্ভবত স্বাধীনতা পত্রিকায় ছাপা দুলাইনের এক ছড়া সেসময় লোকমুখে ছড়ানোর পাশাপাশি গৃহস্থের দেওয়ালেও উঠে এসেছিল। খুব চলেছিল সেই দুলাইন, বাংলার মসনদে নলিনী-বিধান, বাংলার কুলবধূ হও সাবধান।

এত তীক্ষ্ন, তীব্র শ্লেষ ও কটাক্ষ এবং নেতা যুগলের কুনজর থেকে নারীসমাজকে বাঁচানোর নির্ভেজাল হুঁশিয়ারি সেই যুগে কী করে কিছু মানুষের মান্যতা পেয়েছিল ভাবতে অবাক লাগে। কিন্তু ওই কটুবাক্যও যে আচম্বিত কিছু নয়, বহু পরে বঙ্গসমাজের প্রথম কমিউনিস্ট অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কমিউনিস্ট শ্রেণিচেতনায় তা নাকি স্বাভাবিক। অশোক মিত্রের শিক্ষা, শালীনতা ও রুচি নিয়ে কোনওদিন প্রশ্ন ওঠেনি। অথচ সেই মানুষটিও রাজনীতির মোড়ক পরে নির্দ্বিধায় বলতে পেরেছিলেন, আমি ভদ্রলোক নই, আমি কমিউনিস্ট!

কমিউনিস্টদের সঙ্গে ভদ্রতার বিরোধ কি তাহলে সাপ ও নেউলের মতো? ষাটের দশকের সেইসব রক্তঝরা দিনে হরেকৃষ্ণ কোঙারের প্রতিটি ভাষণে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার হুমকি থাকত। দাদার মতো ভাই বিনয় কোঙারও ছিলেন দক্ষ, দ্বিধাহীন ও জড়তামুক্ত। নইলে লাইফ হেল করে দেব হুমকির পাশাপাশি কেউ কি দলের মহিলাদের বলতে পারতেন, ওই মেধা-টেধারা (পাটেকর) গেলে আপনারা তাদের পাছা দেখাবেন? নিতম্বের চলিত প্রতিশব্দের সেই ব্যবহারে তৎকালীন শিক্ষিত মহলে সে কী প্রবল আলোড়ন! অথচ তারও আগে নাট্যমঞ্চে উৎপল দত্তর কণ্ঠে পোঁদ শুনে সুশীল বাঙালিই কিন্তু হাততালিতে ফেটে পড়েছিল! বিনয়বাবু নিজেই একদিন সেই ব্যাখ্যা শুনিয়ে বলেছিলেন, আমরা কমিউনিস্টরা নিত্য ওঠাবসা করি চাষাভুষো, কুলিকামিন, খেটেখাওয়া মানুষদের সঙ্গে। ওদের ভাষা আলাদা। মূল্যবোধ আলাদা। জীবন দেখার দৃষ্টি আলাদা। ওরা পাছাকে পাছাই বলে, পোঁদকে পোঁদ। ওদের সঙ্গে ওদের মতো হয়ে মিশতে হয়। নইলে তেলে-জলে মিশ খায় না।

কী আশ্চর্য, বিজেপির ত্রিপুরা জয়ের নেপথ্য নায়ক সুনীল দেওধরের কণ্ঠেও শুনেছিলাম একসুর। বলেছিলেন, ছিলাম নিরামিষাশী। আদিবাসীদের একজন হওয়ার তাগিদে মাছ-মাংস খেতে শিখেছি। ভাষা যখন সন্ত্রাস হয়ে দাঁড়ায়, ভাষাসন্ত্রাস যখন ভোট রাজনীতির হাতিয়ার হয়, শালীন-অশালীনের বেড়া তখন উধাওই শুধু নয়, অপ্রাসঙ্গিকও হয়ে পড়ে। নোংরা বা অসভ্য ভাষা বলার এই স্বাধীনতা, ইংরেজিতে যা কোপ্রোলেলিয়া, তখন একমাত্র দস্তুর। কে কত লোক খেপাতে পারে, চলে তারই প্রতিযোগিতা। গোলী মারো সালোঁ কো হয়ে ওঠে রাজনীতির পরিচিত ও প্রয়োজনীয় বর্ম। জেতার অদম্য তাগিদে মার্কিন মুলুকের মতো সভ্য দুনিয়াতেও যা সর্বগ্রাহ্য ও স্বাভাবিক করে তুলতে চেয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

কালীপ্রসন্ন সিংহ উনবিংশ শতকের বাবু বাঙালির ঘোমটার আড়ালের পরিচয় জানিয়েছিলেন বলে ফুলবাবুরা রে-রে করে উঠেছিলেন। ক্ষিপ্ত ভোলানাথ বন্দ্যোপাধ্যায় পালটা লিখেছিলেন আপনার মুখ আপুনি দেখ। ছেড়ে কথা বলেননি সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রও। বঙ্গদর্শন পত্রিকায় লিখেছিলেন, লিখনের উদ্দেশ্য শিক্ষাদান ও চিত্তসঞ্চালন। এই মহৎ উদ্দেশ্য হুতোমি ভাষায় কখনো সিদ্ধ হইতে পারে না। হুতোমি ভাষা তাঁর মতে দরিদ্র, বাঁধনহীন, নিস্তেজ, অসুন্দর ও পবিত্রতা শূন্য। যে ভাষায় কখনো গ্রন্থ প্রণীত হওয়া উচিত নহে।

বঙ্কিমের কাছে যা ছিল স্ট্রিক্টলি নো নো, শিল্প বিকাশ, নগরায়ণ ও মধ্যবিত্ত সমাজের প্রসার ও ব্যাপ্তিতে সেটাই হয়ে উঠেছে নিউ নর্মাল। জন্ম হয়েছে নতুন ভাষা, নতুন মূল্যবোধ, নতুন স্টাইল স্টেটমেন্টের। সাহিত্য, সংগীত, সিনেমা, শিল্প ও দৈনন্দিন আচরণে নিম্নবর্গীয় সংস্কৃতির প্রাধান্য ক্রমশ গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, রুচিশীল ও শালীন সমাজও বদলে যাচ্ছে কালের নিয়মে। রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রদের এই মধ্যবিত্ত জাগরণ অদেখা ছিল।
কাঁসিরাম-মায়াবতীদের তিলক, তরাজু ঔর তলোয়ার, ইনকো মারো জুতে চার এর পাশে আজকের তুইতোকারি স-কারন্ত ব-কারন্তের বাড়াবাড়ি রকমের ভাষাসন্ত্রাস এক অন্য দিনবদলের পালা। সেই পালায় উচ্চ ও মধ্য মেধা অদৃশ্য ও কোণঠাসা। দাপাদাপি নিম্ন মেধার। দিন গেল বলে হরির নামে হাহাকারে কী লাভ?

(লেখক বিশিষ্ট সাংবাদিক)