উত্তর দিনাজপুরে সংখ্যালঘু, রাজবংশী আর উদ্বাস্তু ভোটই নির্ণায়ক শক্তি

533

আজকের পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে যদি বিধানসভা ভোট হয়, তাহলে কী হতে পারে ভোটচিত্র। আমাদের রিপোর্টাররা, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা, যাঁরা প্রতিনিয়ত সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কর্তা, পুলিশকর্মী, রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের সঙ্গে মেলামেশা করেন, তাঁরা মাটিতে কান পেতে বোঝার চেষ্টা করেছেন- এই মুহূর্তে জেলার পরিস্থিতি কেমন, কোন অঙ্কে জেলাবাসীর ভোট কোন দিকে পড়তে পারে। জেলায় ভোটারদের ক্ষোভ, প্রত্যাশা কেমন।  সমীক্ষায় আমরা দেখেছি, বাম-কংগ্রেস জোট হলে, ভোট কাটার অঙ্কে তারা অনেক কেন্দ্রে নির্ণায়ক হলেও, উত্তরবঙ্গে হাতে গোনা কয়েকটি আসন ছাড়া জেতার মতো শক্তি এই মুহূর্তে তাদের নেই। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে, উত্তরবঙ্গের মাটিতে তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে সরাসরি লড়াই হতে চলেছে। তাই আমাদের নির্বাচনি বিশ্লেষণ এই দুই দলকে নিয়ে। মনে রাখতে হবে, এই পুরো বিশ্লেষণটাই ২০২০-র সেপ্টেম্বরে দাঁড়িয়ে ভোটের এখনও সাত-আট মাস দেরি। এর মধ্যে বদলে যেতে পারে অনেক কিছু।

রায়গঞ্জ ও ইসলামপুর ব্যুরো : ২০১৯-র লোকসভা ভোটের ফল দেখে নাকি উত্তর দিনাজপুরের পোড়খাওয়া সংখ্যালঘু সিপিএম নেতারা চমকে উঠেছিলেন। ২০১৪-র লোকসভা ভোটে মসজিদ-মাদ্রাসায় ঢুকে মহম্মদ সেলিম যেভাবে প্রচার করেছিলেন তাতে সংখ্যালঘু ভোটাররা দুহাত তুলে সিপিএমকে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু ২০১৯-য় এসে সেই ভোটব্যাংক এককথায় সিপিএমের পাশ থেকে উধাও হয়ে গেল। রাতারাতি ১ লক্ষ ৮২ হাজারের কাছাকাছি ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে গেলেন সেলিম। সেই জায়গায় সাড়ে চার লক্ষেরও বেশি ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছিলেন কানাইয়ালাল আগরওয়াল। বিজেপির দেবশ্রী চৌধুরীর কাছে প্রায় ৬০ হাজার ভোটে হেরেছিলেন তিনি। জেলায় বিজেপির লোকসভা আসন দখলের থেকেও আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল কানাইয়ালাল আগরওয়াল কীভাবে এত ভোট পেলেন?

- Advertisement -

উত্তর দিনাজপুরের সংখ্যালঘু ৪৮ শতাংশ ভোটার ২০১৮ থেকে একটা কথা খোলাখুলি বলে থাকেন। তা হল- মোদির হাত থেকে বাঁচতে হলে দিদি। রাজ্য ও কেন্দ্রে ক্ষযিষ্ণু সিপিএম যে তাঁদের পাশে থাকলেও তাতে লাভ নেই, সেটা বুঝেই জেলার এই ভোটব্যাংক এখন তৃণমূলের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে। জেলার ৪৮ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট আগামী বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের বড় ভরসার জায়গা। এমনিতেই উত্তর দিনাজপুরে ভোট হয় মেরুকরণের ভিত্তিতে। এখানে সংখ্যালঘুদের মধ্যে তৃণমূলের প্রভাব যতটা, হিন্দু ভোটে ততটাই মুঠো শক্ত করতে চাইছে বিজেপি। জেলায় রাজনীতি সচেতন অনেকে বলেন, একসময় এই সংখ্যালঘু ভোট একতরফাভাবে কংগ্রেস ও বামেদের ছিল। সিপিএম-ফরওয়ার্ড ব্লক তাদের সংগঠন কিছুটা ধরে রাখলেও কংগ্রেস জেলায় কার্যত কোমায় চলে গিয়েছে। আবার বামেদের সংগঠন থাকলেও তাদের ভোটটা যে বামেদের রয়েছে, এমন কথা বাম নেতারা জোর গলায় বলতে পারেন না। ফলে আগামী বিধানসভা ভোটের ফল এই জেলায় সংগঠন, প্রার্থী ও নেতাদের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা, স্থানীয় ইস্যু আর অবশ্যই মেরুকরণের জটিল অঙ্কে নির্ধারিত হবে।

আমাদের সমীক্ষা বলছে, লোকসভায় রায়গঞ্জ আসন দখল করেও এই জেলায় বিজেপি কিন্তু তাদের সংগঠন সেভাবে গড়ে তুলতে পারেনি। একইসঙ্গে জেলায় তাদের নেতত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও যোগ্য মুখের অভাব রয়েছে। আর এই দুই ব্যর্থতার জন্যই দাড়িভিট বা মাম্পি সিংহের মৃত্যুর মতো স্থানীয় ইস্যুকেও সেভাবে নিজেদের কাজে লাগাতেও পারেনি বিজেপি। দাড়িভিটে দুই ছাত্রের মৃত্যুকে ইস্যু করে বিজেপি প্রথমদিকে ঝাঁপালেও পরে তারা অনেকটাই পিছিয়ে পড়ে। এজন্য দলের মধ্যেই সাংসদ দেবশ্রী চৌধুরির বিরুদ্ধে ক্ষোভ রয়েছে। জেলা বিজেপির এক নেতা আক্ষেপ করেছেন, তৃণমূল-বিরোধী উদ্বাস্তু ভোটকে এককাট্টা করে নিজেদের দিকে নিয়ে আসার যে সুবর্ণ সুযোগ বিজেপি পেয়েছিল তা সাংসদ আর দলের নেতাদের কৌশলগত ভুলের জন্যই আমরা হারিয়েছি। মন্ত্রী হয়ে তিনি সংসদে দাড়িভিট ইস্যুতে মুখ না খোলায় ওই ভোটারদের একটা বড় অংশ আমাদের বিরুদ্ধে চলে গেলেন। আবার ঘটনার সিবিআই তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে মামলা করে দলের নেতারাই যেন রাজ্যের শাসকদলের হাতে সময় কাটানোর অস্ত্র তুলে দিয়েছেন। একইভাবে মাম্পি সিংহের ইস্যুতেও বিজেপি নেতৃত্ব যেভাবে জাতীয় সড়কে তাণ্ডব চালিয়েছিলেন তা এলাকার সাধারণ মানুষ খুব একটা ভালো চোখে নেননি। এমনকি বাস্তবে ঠিক কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে বিজেপি নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ওয়াকিবহালও ছিলেন না। ফলে স্থানীয় ইস্যুকে অন্তত জেলাস্তরে নিয়ে গিয়ে উদ্বাস্তু এবং ২০ শতাংশ রাজবংশী ভোটকে নিজেদের মুঠোয় আনার ক্ষেত্রেও বিজেপি পুরোপুরি সফল হয়নি।

বিজেপির এই সাংগঠনিক ব্যর্থতাই তৃণমূলকে উত্তর দিনাজপুর জেলায় অনেকটা স্বস্তি দিচ্ছে। সমীক্ষার অঙ্ক বলছে, চোপড়া ও গোয়ালপোখরে সংখ্যালঘু ভোটারদের জন্যই তৃণমূল অনেকটা নিশ্চিন্ত। চাকুলিয়া ফরওয়ার্ড ব্লকের শক্ত ঘাঁটি হলেও এখানে আলি ইমরান রমজ (ভিক্টর)-এর জন্যই হিন্দু ভোটারদের একটা বড় অংশ বামেদের ওপর ক্ষুব্ধ। ফলে তাঁরা এবার কী করেন, তার ওপর চাকুলিয়ার অঙ্ক অনেকটাই নির্ভর করবে। আবার বাম-তৃণমূলের মধ্যে সংখ্যালঘু ভোট কাটাকাটির অঙ্কে এখানে বিজেপির ভাগ্য খুলতে পারে। করণদিঘি ও হেমতাবাদে গৌতম পালের মতো নেতাদের হাতে তৃণমূলের সংগঠন শক্তিশালী হলেও এই দুই আসনে রাজবংশী ভোটের ভরসায় বিজেপি লড়াই করবে। একইভাবে ইটাহার ও কালিয়াগঞ্জেও তৃণমূল-বিজেপির কড়া টক্কর হবে।

উত্তর দিনাজপুরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুটো আসন রায়গঞ্জ আর ইসলামপুর। এককথায় বলা যায়, মোহিত সেনগুপ্তের জন্যই রায়গঞ্জে কংগ্রেসকে উপেক্ষা করা যাবে না। কংগ্রেসের নেতারা যখন গোটা রাজ্যে জার্সি বদল করেছেন তখন অনেককিছু পাওয়ার হাতছানিকে উপেক্ষা করে মোহিতবাবু কংগ্রেসে থেকে গিয়েছেন। আর এই জায়গা থেকেই রায়গঞ্জে কংগ্রেসের প্রতি সাধারণ মানুষের একটা সহানুভতির জায়গা রয়েছে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, রায়গঞ্জে কিছুটা হলেও বিজেপি তাদের সংগঠনকে গুছিয়েছে। আর হিন্দু ভোটাররা বিজেপির প্রতি আনুগত্য দেখালে ফল অন্যরকম হতে পারে। অন্যদিকে, ইসলামপুর বিধানসভা আসনে তৃণমূলের সবচেয়ে বড় সমস্যা কোন্দল। কানাইয়ালাল আগরওয়াল-আব্দুল করিম চৌধুরীর বিরোধ যেভাবে দলের গোষ্ঠী রাজনীতি তৈরি করেছে তার অনেকটা ফায়দা বিজেপি তুলছে। সমস্যা হল, এখানে আব্দুল করিম চৌধুরী প্রার্থী না হলে প্রকাশ্যেই তৃণমূল-বিরোধী হয়ে যান। এমনকি দলনেত্রীকে তুলোধোনা করতেও ছাড়েন না। আবার তিনিই কয়েকমাস পর আনুগত্য দেখিয়ে দলে ফিরে আসেন। অশীতিপর করিম চৌধুরীর তুলনায় কানাইয়ালাল আগরওয়ালের ওপর দল বেশি আস্থা রাখতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে করিমের অনুগতদের ভোট তৃণমূলের দিকে আসবে কি না, সেই সন্দেহ থেকেই যায়। গোষ্ঠীকোন্দলের এই অঙ্কে আসন হাতছাড়া হওয়ার আফসোস করতে হতে পারে তৃণমূলকে। এসবের বাইরেও কিছু ফ্যাক্টর থেকেই যাচ্ছে। এমনিতেই রাজ্যে পিছনের সারিতে থাকা জেলাগুলির অন্যতম উত্তর দিনাজপুর। তৃণমূল সরকারের আমলে রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়, রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ, ইসলামপুর সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল, প্রতি ব্লকে কিষান মান্ডি হলেও মুখ্যমন্ত্রী জেলা থেকে যেভাবে এইমস সরিয়ে নিয়েছেন তার ক্ষত তৃণমূলের জেলা নেতারা সারাতে পারেননি। তবে, শিক্ষাশ্রী, কন্যাশ্রী, সবুজ সাথীর মতো প্রকল্পের সুফল এই জেলার নিম্নবিত্ত বহু পরিবারের কাছে পৌঁছেছে। অন্যদিকে বহু প্রকল্পের সুফল পেতে সাধারণ মানুষকে যেভাবে কাটমানি দিতে হয়েছে, সেজন্য ক্ষোভও রয়েছে। ফলে সব অঙ্কে উত্তর দিনাজপুর জেলা এখনও সব দলের কাছেই অনিশ্চিত।