পরতে পরতে আস্থা ও বিশ্বাস, আজও পবিত্রতার নজির বারাণসী

118

Online Desk: ‘কথায় বলে বার্ধক্যের বারাণসী’। তবে শুধু বার্ধক্যের নয়। ভারত-আত্মার খোঁজ করতে চাইলে জীনের যে কোনও সময়েই বারাণসী হতে পারে আপনার গন্তব্য। উত্তর প্রদেশের এই প্রাচীন শহরের বয়স অন্তত ৩,০০০ বছর। নানা কারণে বারাণসীর খ্যাতি। তার অন্যতম যদি হয় বিশ্বনাথের মন্দির, তবে অন্য বড় কারণটি অবশ্যই শহরজুড়ে থাকা গঙ্গার একের পর এক ঘাট। যেকোনও ঘাটে গিয়ে দাঁড়ালেই মনে হবে এটা যেন অন্য কোনও একটা জগৎ। থিকথিকে ভিড়, গাড়ির হর্ণ, ইতিউতি ছড়ানো বর্জ্যর মাঝেও মনে হবে যেন অন্য দেশে চলে এসেছেন। গেরুয়া বসন পরা সাধু, মন্ত্রের উচ্চারণ, পর্যটকদের উচ্ছ্বাস, স্নানের শব্দ, জ্যোতিষীদের মেলা, আর বিখ্যাত সন্ধ্যারতি, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ‘মেথড ইন ম্যাডনেস’! আর ফেলুদাপ্রিয় বাঙালিরতো বারাণসীর ঘাটের সঙ্গে আত্মার যোগ থাকবেই।

দক্ষিণে অসিঘাট থেকে শুরু করে উত্তরে রাজঘাটের মধ্যে বারাণসীতে গঙ্গার ধার বরাবর ছড়িয়ে রয়েছে অনেক ঘাট। যার পরিচিতিও ভিন্ন ভিন্ন কারণে। গঙ্গা যেখানে অসি নদীর সঙ্গে মিশেছে সেখানেই এই অসি ঘাট। কথিত আছে দেবী দুর্গা শুম্ভ আর নিশুম্ভ নামক দুই রাক্ষসকে হত্যা করার পর তাঁর অসি বা তরবারি এই নদীতে ফেলেছিলেন। গুরুত্বের বিচারে দশাশ্বমেধ ঘাটের নাম বহু প্রচলিত। এই ঘাটেই হয় বিখ্যাত গঙ্গা-আরতি। সন্ধ্যার সময় সেই আরতি দেখতে ভিড় করেন দেশি-বিদেশি অসংখ্য পর্যটক। গমগমে কন্ঠে মন্ত্রোচ্চারণে আরতি পরিবেশকে ভিন্ন মাত্রা দেয়।

- Advertisement -

তবে বারাণসীর সঙ্গে যদি বার্ধ্যকের যোগ থাকে তাহলে মণিকর্নিকা ঘাটের সঙ্গে অবশ্যই যোগ রয়েছে মৃত্যুর। মৃত্যুর পর এখানে শেষকৃত্য হলে পুনর্জন্মের হাত থেকে মুক্তি মিলবে। অন্তত প্রচলিত বিশ্বাস এমনটাই। মানুষের বিশ্বাস, এই ঘাটে কখনও নাকি চিতার আগুন নেভে না। এছাড়াও নানা কারণে মণিকর্নিকাকে পবিত্র তীর্থ মনে করা হয়। কথিত আছে এই ঘাটে হরপার্বতী স্নান করেছিলেন। তখন পার্বতীর কানের মণিরত্নখচিত কুণ্ডলটি জলে পড়ে যাওয়ায় বিষ্ণু সেটি খুঁজে পান। স্কন্দপুরানে বলা আছে সব পবিত্র তীর্থের থেকেও মণিকর্নিকায় স্নান করলে বেশি পুণ্যলাভ হয়। উত্তরবাহিনী গঙ্গায় এই ঘাটের অবস্থান সব ঘাটের মাঝামাঝি। এখানে রয়েছে তারকেশ্বর শিবের মন্দির। মনে করা হয় এখানে প্রতিটি মৃত্যুপথযাত্রীর কানে তারকব্রহ্ম মন্ত্র জপ করেন স্বয়ং মহাদেব। আর তাতেই মোক্ষ লাভ হয়। এর বাইরেও ভোঁসলে ঘাট, মীরঘাট, চৈত সিং ঘাট সহ বহু ঘাট জড়িয়ে রেখেছে বারাণসীকে। আর প্রতিটি ঘাটের ভিন্ন ইতিহাস, ভিন্ন চরিত্র, যা না দেখলে বলে বোঝাবার নয়। এক কথায় প্রতিটি ঘাটই যেন এক চলমান ইতিহাস, যা কিনা এই একুশ শতকেও সমান প্রাসঙ্গিক।

তবে ঘাটের পরিচিতির বাইরেও আরও কিছু উপাদান বারাণসীকে পর্যটকদের কাছে পরিচিত করেছে। তার অন্যতম হল মুখরোচক খাবার। কচুরি থেকে পেঁড়া, রাবড়ি, জিলিপি, এমনকি বেনারসী পান এমন বহু খাবারই রয়েছে যা কিনা বারাণসী দর্শনের অঙ্গ। ঘন দুধের তৈরি অসাধারণ জিভে জল আনা ঠান্ডাইয়ের খ্যাতিও বারাণসীর সঙ্গে জড়িয়ে। দুধের সঙ্গে অল্প ভাং মিশিয়ে যে ঘোল তৈরি হয়, তার তুলনা ভূভারতে মেলা ভার। এরকমই আরেকটি পানীয়র নাম হল মালাইয়ো। এই মালাইয়ো বেনারসের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মিষ্টি। এটি একপ্রকার পার্সি খাবার, যা দুধ ও ক্রিম দিয়ে তৈরি করা হয়। ফুচকার পরিচিতি এখানে গোলগাপ্পে নামে। দই, পুদিনা ও তেঁতুলের চাটনি দিয়ে পরিবেশন করা গোলগাপ্পের ভিতর থাকে বিভিন্ন মশলা দিয়ে মাখা আলু। আর বেনারসী পানের খ্যাতিতো জগৎজোড়া। নানা মশলার সমন্বয়ে এই পানের স্বাদ না পেলে আপনার বেনারস ভ্রমণই বৃথা। তাই শুধু পুণ্যলাভ নয় রসনা তৃপ্তির জন্য খাদ্যান্বেষনও হতে পারে বারাণসী ভ্রমনের এজেন্ডা।