ধূপগুড়ি ও ময়নাগুড়ি :  ধূপগুড়ির ব্লকের মাগুরমারি-১ গ্রাম পঞ্চায়েত এবং মাগুরমারি-২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার নাম রয়েছে মাছের নাম অনুযায়ী। এলাকার প্রবীণ নাগরিকরা জানিয়েছেন, এই এলাকার নদীগুলিতে আগে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। বামনি, গিলান্ডি, সান্তাই নদীতে মাছ ধরে বাসিন্দারা জীবিকা নির্বাহ করতেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এলাকাগুলি থেকে মাছের সেই পুরোনো জৌলুস হারিয়ে গিয়েছে। এখন আর এই নদীগুলিতে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। নদীয়ালি মাছ হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নদীগুলির নাব্যতাও হারিয়ে যেতে বসেছে। এলাকার প্রবীণ নাগরিক নারায়ণচন্দ্র রায় বলেন, এই সব এলাকায় একসময় প্রচুর পরিমাণে মাছ পাওয়া যেত। মাগুরমারিতে মাগুর মাছ বেশি পাওয়া যেত। তাই এই এলাকার নাম হয়ে যায় মাগুরমারি। খট্টিমারিতে খট্টিমাছ বেশি পাওয়া য়ায় বলে সেখানকার নাম হয় খট্টিমারি। ডাউকিমারিতে ডাউকি পাখি বেশি থাকায় সেখানকার নাম হয় ডাউকিমারি। কালীরহাট স্কুলের ভূগোলের শিক্ষক কৃষ্ণ রায় বলেন, এখন দেখা যাচ্ছে য়ে এই এলাকাগুলিতে য়ে সব নদী রয়েছে, মাটি ক্ষয়ে ফলে সেই নদীগুলির নাব্যতা কমে গিয়েছে। নদীগুলি বুজে যাওয়ায় মাছ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। আজকাল নালা ভরাট করারও প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি হচ্ছে। জায়গাগুলির নামের মধ্যে মাছের নাম দিয়ে থাকলেও মাছের সেই জৌলুস হারিয়ে যাচ্ছে।

একই অবস্থা ময়নাগুড়ির। একসময় ময়নাগুড়ি থেকে ডুয়ার্সের বিভিন্ন বাজারে নদীয়ালি মাছ যেত। কিন্তু এখন সেই ময়নাগুড়িতেই নদীয়ালি মাছ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। যত দিন য়াচ্ছে, মাছের এই অভাব বেড়েই চলেছে।ময়নাগুড়িতে ৮টি নদী ও বিভিন্ন ঝিল রয়েছে, যেগুলিতে নদীয়ালি মাছ পাওয়া যায়। আগে মাছ আসত তিস্তা, জলঢাকা, সানিয়াজান, শৌলি, কালুয়াডাঙ্গি, ঝাজাঙ্গি কুড়া, ধরলা, নয়া নদী, কয়া নদী থেকে। কিন্তু দিনদিন সেই নদীগুলি থেকে মাছের জোগান কমে যাওয়ার বিষয়ে ময়নাগুড়ি কলেজের ভূগোল বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডঃ মধুসূদন কর্মকার বলেন, নদী এবং পুকুরের পরিবেশ মাছের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। এর মূল কারণ অবশ্যই দূষণ। পাহাড় থেকে ডলোমাইট ভেসে আসছে নদীর জলে। ডলোমাইটে প্রচুর পরিমাণে ক্ষার রয়েছে। নদী ও জলাশয়গুলিকে ডাম্পিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে। আবাদি জমি ও চা বাগানে প্রচুর পরিমাণে কীটনাশক স্প্রে করা হচ্ছে, যার জেরে নদীর জল দূষিত হচ্ছে। হেলাপাকড়ির মত্স্যজীবী নীরেন দাস বলেন, আগে সানিয়াজানে সারাদিন শোল, টাকি, পুঁটি, ট্যাংরা, ভ্যাদা, শিঙি ও মাগুর মাছ শিকার করতাম। এখানকার মত্স্যজীবীরা সরাসরি মাছ পৌঁছে দিতেন জলপাইগুড়ি, ময়নাগুড়ি সহ ডুয়ার্সের বিভিন্ন বাজারে। সেই সানিয়াজান এখন আবর্জনায় প্রায় বুজে গিয়েছে।

ময়নাগুড়ি ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক সুশীল দাস বলেন, এবার বাজারে নদীয়ালি মাছ তেমন নেই। গত বছরেও এমনটা ছিল না। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মত্স্যজীবী সমিতির ময়নাগুড়ি ব্লক সম্পাদক সুভাষ দাস বলেন, নদীয়ালি মাছ যেন উধাও হয়ে গিয়েছে। মত্স্যজীবীরাও তাঁদের পেশা থেকে মুখ ফিরিয়েছেন। তাঁরা পরিবারের খরচ জোগাতে মজুরের কাজ করছেন, কেউ বা ভিনরাজ্যে যাচ্ছেন কাজের খোঁজে। প্রশাসনের উচিত জলাভূমিকে রক্ষা করে, দূষণমুক্ত করে মাছের বাসযোগ্য করে তোলা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ করা। ময়নাগুড়ি রোড পরিবেশপ্রেমী সংগঠনের সম্পাদক নন্দু রায় বলেন, আগে তিস্তা এবং জলঢাকা নদীতে যে পরিমাণ মাছ হত সেটাই ডুয়ার্সের বাজারের চাহিদা পূরণ করত। ময়নাগুড়িতে নদীয়ালি মাছের আলাদাভাবে ডাক হত। এখন নদীগর্ভ ভরাট হয়ে গিয়েছে। মাঝেমধ্যেই নদীর জলে বিষতেল ঢেলে মাছ শিকার করা হচ্ছে। নদীর ভারসাম্য হারিয়ে গিয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামীদিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।