অরুণ ঝা, ইসলামপুর : কেউ বলছেন শিক্ষার নামে প্রহসন, কেউ বলছেন রাজনৈতিক ঘুঘুর বাসা। আবার কারও মত হল নামেই শিক্ষাঙ্গন। আসলে ছাত্র রাজনীতির নামে কলেজে বাহুবলী তৈরি করাই অন্যতম অ্যাজেন্ডা। প্রায় ১২ হাজার পড়ুয়ার ইসলামপুর কলেজের এই চিত্রই জনমানসে তৈরি হয়ে রয়েছে। ইসলামপুর কলেজে পরীক্ষা মানেই গণটোকাটুকি। পঠনপাঠন নিয়ে বড় অংশের পড়ুয়া এবং শিক্ষকদের উদাসীনতা চোখে পড়ার মতো। বুধবার বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে কলেজে ঢুকে নজিরবিহীন ছবি দেখা গেল। কলেজের অস্থায়ী টিচার ইন চার্জ ছাড়া তখনও অন্য কোনও শিক্ষক কলেজে আসেননি। পড়ুয়াদের বড় অংশের অনুপস্থিতির কারণেই শিক্ষকদের নাকি এই উদাসীনতা। তবে পড়ুয়াদের একাংশ শিক্ষকদের সময়ে না আসা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, একসঙ্গে সব পড়ুয়া কলেজে এলে তাঁদের বসানোর জায়গা দেওয়া যাবে না। ফলে সমস্যার কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। মুখ্যমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীর গোচরেও বিষয়টি আনা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষকদের সময়ে না আসা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। সঙ্গে কলেজে আগের মতো মস্তানরাজ ও ছাত্র রাজনীতির নামে অবৈধ লেনদেন নেই বলেও কর্তপক্ষের দাবি।

এদিন কলেজে ঢুকে দেখা গেল সমান্য কিছু পড়ুয়া কলেজে উপস্থিত। উপস্থিতির বড় অংশই আবার মাঠে ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছে। টিচার্স কমন রুমে দেখা গেল অস্থায়ী টিআইসি কালীপদ সরকার একা বসে রয়েছেন। এখনও কোনও শিক্ষক আসেননি কেন, প্রশ্ন করতেই কালীপদবাবু কার্যত অস্বস্তিতে পড়ে যান। তিনি আবহাওয়ার দোহাই দিয়ে শিক্ষকদের অনুপস্থিতি ঢাকার চেষ্টা করেন। ইতিমধ্যে কলেজে উপস্থিত বেশ কিছু পড়ুয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা যায় কলেজের পরিকাঠামো এবং শিক্ষকদের বড় অংশের সময়ে না আসা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে।

ক্লাসরুমের অভাবে কলেজে পাস কোর্সের কোনও ক্লাস কার্যত হয় না বললেই চলে। ১২টা ৩০ নাগাদ একে একে শিক্ষকদের কলেজে ঢুকতে দেখা যায়। তাঁদের সঙ্গে অশিক্ষক কর্মীরাও ঢুকছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পড়ুয়ার কথা অনুসারে, কলেজে নিয়মের কোনও বালাই নেই। যেমন খুশি চলছে।

গণটোকাটুকির জন্য ইসলামপুর কলেজ আগাগোড়াই কুখ্যাত। অতিরিক্ত পড়ুয়ার বোঝা এবং পরিকাঠামোর অভাবের সুযোগে টোকাটুকি মাত্রাছাড়া আকার নিয়েছে বলে শিক্ষকদের একাংশের দাবি। এক শিক্ষক জানিয়েছেন, পরীক্ষার নামে প্রহসন হয়। চোখ বন্ধ করে রাখা ছাড়া আমাদের কোনও কাজ নেই। কলেজ সূত্রেই জানা গিয়েছে, পাস কোর্সের পরীক্ষার সময় একটি বেঞ্চে ৫ থেকে ৬ জন করে পড়ুয়াকে বসানো হয়। তাতেও পরিস্থিতি সামাল না দেওয়া গেলে মেঝেতে বসিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়।

কলেজের এক প্রবীণ শিক্ষক বলেন, আসলে ছাত্র রাজনীতির নামে গত কয়েক দশকে ইসলামপুর কলেজের পঠনপাঠনের পরিবেশের মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলা হয়েছে। তোলাবাজি ও রাজনৈতিক দাদাগিরির তকমা ইসলামপুর কলেজের কপালে সেঁটে গিয়েছে। দীর্ঘদিন কলেজে কড়া মনোভাবের প্রিন্সিপাল নেই। ফলে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার দায়িত্ব কে নেবে?

রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলের গোষ্ঠী কাজিয়ার প্রভাব কলেজের পঠনপাঠনের উপরেও পড়ছে। সব মিলিয়ে ইসলামপুরের শিক্ষার পরিবেশের স্বার্থে আরও একটি কলেজের প্রয়োজন বলে সব মহলে জোর দাবি উঠতে শুরু করেছে। প্রয়োজনে একটি আলাদা মহিলা কলেজ গড়ে উঠলেও ১২ হাজার পড়ুয়ার বোঝা থেকে ইসলামপুর কলেজ নিস্তার পেলে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে বলে মনে করছেন অভিভাবকরা। শিক্ষকদের সময়ে না আসা সহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে অস্থায়ী টিআইসি কালীপদবাবু বলেন, আসলে পড়ুয়াদের সমান্য উপস্থিতি এবং খারাপ আবহাওয়ার কারণে এদিন একটু সমস্যা হয়েছে। অনার্সের ক্লাস এবং পরীক্ষার পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক ভালো হয়েছে। তবে অতিরিক্ত পড়ুয়ার কারণে পাস কোর্সের ক্লাস নিতে আমাদের সমস্যায় পড়তে হয়। কলেজের টিআইসি কাজলরঞ্জন বিশ্বাস বলেন, পারিবারিক কারণে আমি ছুটিতে আছি। তবে কলেজের সমস্যাগুলি অস্বীকার করার উপায় নেই। পরিস্থিতির কথা মুখ্যমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীকে বিস্তারিত জানিয়েছি। শিক্ষকদের সময়ে উপস্থিত হওয়ার বিষয়ে ইতিমধ্যে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছিল।

কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মহম্মদ মনজর বলেন, কলেজের পরিকাঠামোর উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের সময়ে আসা ভীষণ জরুরি। না হলে পড়ুয়াদের সমস্যা সহজে মেটার নয়। প্রথম বর্ষের পড়ুয়া নিশাদ ফতেমা বলেন, ক্লাসঘরের প্রচণ্ড অভাব রয়েছে। বিশেষ করে পরীক্ষার সময় পড়ুয়াদের কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। শিক্ষকদের সময়ে না আসাও বড় সমস্যা। দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়া ঋতু সিংহ বলেন, শিক্ষকদের সময়ে আসা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। আশা করি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দেখবে। দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়া মুকেশ কর্মকার বলেন, শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ না থাকলে সবাইকে ভুক্তভোগী হতে হয়। পরিকাঠামো উন্নয়নের ভীষণ প্রযোজনীয়তা রয়েছে। সঙ্গে শিক্ষকদের নিয়মানুবর্তিতার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

কলেজ পরিচালন সমিতির সভাপতি কানাইয়ালাল আগরওয়াল বলেন, আসলে সমস্ত পড়ুয়া একসঙ্গে কলেজে উপস্থিত হলে তাদের বসার জায়গা দেওয়া যাবে না। কলেজের টিআইসির সঙ্গে এই নিয়ে উত্তরকন্যায় সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর কথা হয়েছে। কলেজে গুন্ডামি বা ভর্তির নামে টাকা তোলার চক্র আমরা বরদাস্ত করিনি। ফলে সেসব আর নেই। তবে শিক্ষকদের সময়ে উপস্থিত না থাকার বিষয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ শীঘ্রই করা হবে।