মানিকচকে ডুবেছে শতাধিক বিঘার সবজি খেত

প্রকাশ মিশ্র, মানিকচক : কয়েকদিনের অতিবৃষ্টিতে মানিকচকের নুরপুরে জলের তলায় চলে গিয়েছে শতাধিক একর সবজি খেত। সবজি চাষে কোটি টাকার বেশি ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ফলে মাথায় হাত পড়েছে কৃষকদের। মালদা জেলার মরশুমি সবজির জোগানের অধিকাংশই নুরপুর থেকে সরবরাহ হয়ে থাকে। এই অবস্থায় ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছেন কৃষকরা। এবিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা পরিষদের সভাধিপতি গৌরচন্দ্র মণ্ডল। গত বছর পুজোর সময়ে বন্যায় একইভাবে নাজিরপুর, নুরপুর প্রভৃতি এলাকার সবজি চাষের ক্ষতি হয়েছিল।

এক সময় মালদায় মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা থেকে ফুলকপি, বাঁধাকপি সহ নানা সবজি আসত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে সেই জায়গা করে নিয়েছে মালদার নুরপুর অঞ্চল। এই অঞ্চলের শীতকালীন সবজির চাহিদা আলাদা। যেমন গুণমান তেমনই স্বাদ। কিন্তু এখানকার সবজি চাষে এবার রাহুর দশা। গত কয়েকদিনের অতিবৃষ্টিতে ডুবে গিয়েছে একরের পর একর সবজির জমি। বীজতলাও জলের তলায় চলে গিয়েছে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, টম্যাটো সহ বিভিন্ন সবজি চাষে প্রায় এক কোটির বেশি টাকার খরচ করে এখন লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকরা। নুরপুর, নাজিরপুর প্রান্তিক বাঁধের ধারে যেদিকে তাকানো যাবে, সবই সবজির এলাকা। সেখানে এখন শুধুই জল আর জল। পাশেই বয়ে গিয়েছে কালিন্দ্রী নদী। বন্যার সময় কালিন্দ্রী নদীর পলি পড়ে নদীতীরবর্তী এলাকাগুলি উর্বর হয়ে ওঠে। সেই জমিতে যে সবজি হয়, তার স্বাদ ও গন্ধ অন্য এলাকার সবজির তুলনায় অনেক বেশি। সেই সবজির জোগান এবার স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় শাকসবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সাধারণ মানুষের। এলাকার চাষি ইমরান খান, আইযুব মিযাঁ, টিক্কা খান, সদাগর খান, মন্টু খান লক্ষ লক্ষ টাকা মহাজনের কাছ থেকে ঋণ করে এখানে চাষ করেছেন। এখন তাঁদের মাথায় হাত।

- Advertisement -

ইমরান খান বলেন, নুরপুর, নাজিরপুর প্রভৃতি এলাকায় প্রায় একশো একরের ওপর এলাকাজুড়ে সবজি চাষ হয়। এখানে আগাম প্রজাতির বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুন, টম্যাটোর চাষ হয়। সাধারণ ফুলকপি, বাঁধাকপি ওঠার আগেই এখানকার সবজি বাজারে চলে আসে। এখান থেকেই গোটা মালদা জেলা ও পার্শ্ববর্তী জেলায় সবজি যায়। এখন মূলত বাঁধাকপি, ফুলকপি, মুলো, বেগুন চাষ হয়েছিল। নীচু এলাকায় জল জমে যাওয়ার ফলে সেই চাষ জলের তলায় চলে গিয়েছে। চাষিরা বেশ কিছু এলাকায় বীজতলা তৈরি করেছিলেন। সেই বীজতলা থেকে ফুলকপি, বাঁধাকপির গাছ জমিতে স্থানান্তরিত করার কথা। একটি বীজতলা তৈরি করতে দুই লক্ষ, তিন লক্ষ টাকা খরচ হয়। সেই বীজতলাও এখন জলের তলায় চলে গিয়েছে। আমরা কী করব, এখন ভেবে পাচ্ছি না। এই অবস্থায় অনেক চাষি পাম্প বসিয়ে জল বের করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিশাল এলাকায় কতটা সম্ভব হবে জানি না। তার ওপরে জল বের করার পরেই আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে যাচ্ছে। ফলে ব্যাপক সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। সাগর খান, টিক্কা খান প্রমুখ কৃষকরা বলেন, এক একর চাষ করতে প্রায় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। এছাড়া যাঁরা জমি লিজ নিয়ে চাষবাস করছেন, তাঁদের অতিরিক্ত ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা খরচ হয়। তাঁদের বহু টাকা লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।

আকবর খান নামে আরেক কৃষক বলেন, এখন ফুলকপি খুবই ছোট অবস্থায় রয়েছে। ১০০ গ্রাম, ২০০ গ্রাম ওজন হবে। কোথাও ফুল ধরেছে। অন্যদিকে বাঁধাকপিও ১০০ গ্রাম, ২০০ গ্রাম। কোথাও ৫০০ গ্রামের আকার নিয়েছিল। এই অবস্থায় জমি জলমগ্ন হয়ে গিয়েছে। যাঁদের উঁচু জায়গা রয়েছে, তাঁরা দ্রুত ফুলকপি, বাঁধাকপি জমি থেকে কেটে নিয়ে বাজারে পাঠিয়েছেন। কিন্তু নীচু এলাকার কৃষকরা আর সবজি বাজারজাত করতে পারেননি। বৃষ্টি থামার নাম নেই। পাম্প চালিয়ে জল বের করার পরেই আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে যাচ্ছে। ফলে আবার জলমগ্ন হচ্ছে সবজি চাষের এলাকা। এই অবস্থায় কৃষকরা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। এপ্রসঙ্গে গৌরচন্দ্র মণ্ডল বলেন, আমার কাছে কৃষকরা এসেছিলেন। তাঁরা এই ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়েছেন। নুরপুর, নাজিরপুর এমনই এক এলাকা, যেখান থেকে সবজি জেলা ও জেলার বাইরে যায়। এখানকার সবজির যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। কৃষকদের একশো একরের বেশি জমির সবজি চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। দুই-তিন কোটি টাকার সবজি নষ্ট হয়েছে। এই অবস্থায় আমরা কৃষি দপ্তর ও বাগিচা উন্নয়ন দপ্তরের সঙ্গে কথা বলব। তাঁদের জন্য কিছু করা যায় কি না,  তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।