প্রেমের উদযাপন একদিনের, মানেন না দীপঙ্কর

225

নিউজ ব্যুরো : প্রেম দিবস! সেটা আবার কী! ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন্স ডের কথা শুনলে, বেজায় চটে যান তিনি। বাংলা ছবির বর্ষীয়ান অভিনেতা দীপঙ্কর দে। মজা করে স্ত্রী দোলনকে বলেন, কোথা থেকে শিখেছ এই সব ইংরেজি কায়দা? তা হলে পরের ১৫-১৬ তারিখের স্ল্যাপ ডে, কিক ডেতে সব একে-অন্যকে কষিয়ে থাপ্পড়-লাথি মারো না কেন হে? আবহমান ছবির অভিনেতার মনে প্রেম সম্পর্কে ধারণা অতি উচ্চ। মানসিকতা অত্যন্ত উদার। যিনি অন্তর থেকে মনে করেন, প্রেমের কোনও নির্দিষ্ট দিন নেই। প্রেমের উদযাপন কখনও একদিনের হয় না। প্রেম আজীবন। আমরণ। যে মনোভাবের কারণেই ৭৫ বছর বয়সে পৌঁছে তাঁর দীর্ঘ ২৫ বছরের প্রেমকে আইনি-সামাজিক স্বীকৃতি দিতে, সমাজের সমস্ত তাচ্ছিল্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবিতে বরবেশে বসতে পারেন বিয়ের বাসরে। লাল জমকালো বেনারসি-ঘটিহাতা ব্লাউজ বেশে তাঁর চেয়ে ২৫ বছরের ছোট স্ত্রী দোলন রায়ের গলায় মালা পরাতে পারেন অনায়াসে। গত বছরের শুরুর মাসেই ৭৫ বছরের বর, ৫০ বছরের কনের এমন অসম বিয়ে ঘিরে অনেকেই রসিকতা-ব্যঙ্গ করলেও, তাতে বিন্দুমাত্র বিব্রত হননি বাঞ্ছারামের বাগান ছবির চারকড়ি দীপঙ্কর। সজনী গো সজনীর দোলন। কারণ কুকথা তো আজ নয়, বছর ২৫ বছর আগে থেকেই আড়ালে-আবডালে বহু শুনতে হয়েছে তাঁদের।

ঘরে-বাইরে লোকজনের কটূক্তিই শুধু নয়। আজ থেকে ২৫ বছর আগে যখন আমাদের প্রেমের কথা চাউর হয়, তখন থেকেই বেশ কিছু প্রযোজকের কাছে অচ্ছুত্ হয়ে গিয়েছিলাম। নানা জন নানা রটনা রটানোয়, আমাকে ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় টিটো (দীপঙ্করের ডাকনাম) নামকরা অভিনেতা। নামের ঝুলিতে সীমাবদ্ধ-শাখা প্রাশাখা-বাঞ্ছারামের বাগান-আগন্তুক-গণশত্রু ছাড়াও কত সব ছবি। আর আমি তখন সদ্য সজনী গো সজনী-দুরন্ত প্রেম-সংঘাত করে সবে ইন্ডাস্ট্রিতে কেরিয়ার গড়ছি। কিন্তু গোড়াতেই গণ্ডগোল। আমাদের প্রেম আমায় অনেকখানিই পিছিয়ে দিয়েছিল ইন্ডাস্ট্রির নায়িকা দৌড়ে। আলোছায়া সিরিয়ালে শটের অবসরে অকপট দোলন। যদিও তা নিয়ে আজ কোনও আফশোস নেই তাঁর। বাঘাযতীন এলাকায় মা-বাবা-ভাইয়ের সংসারে একসময় দেখেছেন নিত্য অভাব। সেই অভাবের তাড়না মেটাতে টিউশন, রেডিয়ো-টিভিতে নাটক করতে করতেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ঘটক বিদায় নাটকে প্রথম অভিনয়ে সুযোগ। সেই নাটক সূত্রে তরুণ মজুমদারের সজনী গো সজনী ছবিতে প্রথম নায়িকা। আসলে কোনও দিনই তেমন কেরিয়ারিস্ট ছিলাম না। তাই জীবনের না-পাওয়া ঘিরে আমার অনুশোচনা নেই। বরং নিজের রোজগারে মা-বাবার বাড়িটা ভালো করে, হাইল্যান্ড পার্কে সুন্দর একটা ফ্ল্যাট যে কিনতে পেরেছি, তাতেই আমি খুশি। সুখী আমাদের প্রেম শেষ পর্যন্ত পরিণতি পাওয়ায়। সাফ জানালেন দোলন।

- Advertisement -

কিন্তু আজকের পরিণতি পাওয়া প্রেমের সূত্রপাত কীভাবে? প্রশ্নের উত্তরে মিষ্টি হাসিতে অনর্গল সীমারেখা সিরিয়ালের রঞ্জনা দোলন। সে কী আর অত মনে রয়েছে? তবে ভুলিনি সবার অলক্ষ্যে বাগানে আমাকে একা পেয়ে সামনে হাঁটু গেড়ে বসে টিটোর প্রেম নিবেদনের স্মৃতি। ভয়ে তো কেঁদেই ফেলেছিলাম। বলেছিলাম, আরে! করছেন কী! আপনি আমার থেকে বয়সে কত বড়! আর আমি তো দেশে ফিরেই বিয়ে করব। কিন্তু তার পরেও টিটোর প্রেম যে হারে বেড়ে গেল, সেখান থেকে আমরা ক্রমশ জড়িয়ে পড়লাম এক অমোঘ আকর্ষণে। আমেরিকায় যে তিনমাস আমরা তখন ছিলাম, প্রতিদিন নিয়ম করে সকাল-রাতে আমায় চিঠি লিখত। রাতের চিঠির সঙ্গে প্রতিদিন দিত একটা কবিতা। ওঁর লেখা সেই সমস্ত কবিতা এক করে রেখেছিলাম। পরে সেটা বই আকারে প্রকাশ পায়। বইমেলায় ভালোই বিকোয়।

দুলাল লাহিড়ি পরিচালিত নাটকের ১৮টা কল শো নিয়ে তিন মাসের জন্য আমেরিকা পাড়ি জমিয়েছিলেন দীপঙ্কর দে, শকুন্তলা বড়ুয়া, কুণাল মিত্র, নবাগতা দোলন। বিদেশ-বিভুঁইয়ে অতদিন থাকতে গিয়ে দীপঙ্করের প্রেম-যত্ন-দেখভালে দোলনের দুর্বলতা জন্মায়। খানিক যেন ফাদারলি ফিলিংস। অন্যদিকে দীপঙ্করকে আকর্ষণ করে দোলনের সহজ-সরল-সুন্দর ব্যবহার। গড়ে ওঠে প্রেম। পরতে পরতে জড়িয়ে পড়েন দুজনায়। যার থেকে এক মুহূর্তের জন্যও বেরিয়ে আসতে পারেননি কেউ। হাইল্যান্ড পার্কের সাজানো ফ্ল্যাটে, দুজনার সাজানো সংসার। কাজের ফাঁকে বই-বাগান-গান নিয়ে নিঃসন্তান দম্পতির দিযাপন।

কখনও সারোগেসি চাইল্ড নেওয়ার কথা ভাবেননি? দোলনের গলায় দ্বিধার সুর, ভেবেছিলাম, কিন্তু সেই সময় বিয়ে সামাজিক স্বীকৃতি না পাওয়ায়, সাহস করে কিছু করে উঠতে পারিনি। আর আজ এই বয়সে পৌঁছে, সন্তান সামলানোর দায়িত্ব নেওয়ার কথা ভাবি না।

তা হলে কি আজ আর কোনও আফশোসই নেই তাঁর মনে? এমন প্রশ্নে যেন একটু থমকালেন দোলন। জানেন, তখন আমি আমেরিকায়। টিটোর সঙ্গে সেই কল শো-তে গিয়েছি। ওখানে জানতে পেরেছিলাম, সংঘাত ছবির জন্য আমি ন্যাশনাল স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। আমার সঙ্গে পেয়েছেন, মাচিস ছবির জন্য তব্বু। আমার সেই জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার কথা, কেউ সেদিন বিশ্বাসই করতে চাননি। হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। দিল্লিতে যেদিন মঞ্চে এই সম্মানের কথা ঘোষণা করা হয়, সেদিন আমার তরফে মা গিয়ে কিরণ খেরের হাত থেকে ট্রফি নেন। আজও যখন বাড়ি যাই, দেখি দেওয়ালে টাঙানো সেই ছবিটা। যেখানে ট্রফি হাতে মা। আমি কোথাও নেই। এটা তো একটা আফশোস, তাই না?