গঙ্গার বাঁধের ভাঙা অংশে সাঁকো বানালেন গ্রামবাসীরা

408

জসিমুদ্দিন আহম্মদ, মালদা: প্রবল জলের তোড়ে গত বছরই উড়ে যায় গোপালপুর এলাহিটোলা রিংবাঁধের কিছুটা অংশ। লাল সতর্কতায় থাকা গঙ্গার জল এই অংশ দিয়ে ইংরেজবাজারের দিকে ঢুকতে শুরু করেছিল। ভাগ্য সহায় থাকায় তখনই গঙ্গার জলস্তর কিছুটা নীচে নেমে আসে। সেবারের মতো বন্যা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গিয়েছিল। তবে একটা বছর পেরিয়ে গেলেও আজও এলাহিটোলা রিংবাঁধের প্রায় ১০০ মিটার অংশ উন্মুক্তই থেকে গিয়েছে। বাঁধের এই অংশের সংস্কার কবে হবে জানা নেই কারোর। বাঁধ কেটে যাওয়ার সঙ্গেই এলাহিটোলা সহ সাতটি গ্রামের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। গ্রামবাসীরা চান, সরকারিভাবে বাঁধের সংস্কার করা হোক।

তবে আপাতত চলাচলের জন্য গোপালপুর গ্রাম পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষ যাতে একটা বাঁশের সাঁকো তৈরি করে দেয়, তার জন্য তৎপর হন গ্রামবাসীরা। সেতু তৈরির জন্য একাধিকবার প্রধান ও পঞ্চায়েত সদস্যর কাছে দ্বারস্থ হয়েছেন তাঁরা। কিন্তু অভিযোগ, তাঁদের আবেদনে সাড়া দেননি প্রধান বা এলাকার পঞ্চায়েত সদস্য। শেষে বাঁশের সাঁকো তৈরির দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন গ্রামবাসীরা। চাঁদা তুলে নিজেরাই বাঁশের ওই সাঁকো তাঁরা তৈরি করে ফেলেছেন। বুধবার তার কাজ শেষ হয়েছে। এতে উপকৃত হলেন সাতটি গ্রামের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। গোপালপুর গ্রাম পঞ্চায়েত মানিকচক ব্লকে। এলাহিটোলা গ্রামটিকে ইংরেজবাজার ও মানিকচকের সংযোগস্থলও বলা যেতে পারে।

- Advertisement -

গ্রামের গা ঘেঁষে বয়ে গিয়েছে গঙ্গা। গঙ্গার গ্রাস থেকে ইংরেজবাজার ও মানিকচককে বাঁচাতে একসময় এখানে তৈরি করা হয় রিংবাঁধ। এই বাঁধের ওপর রয়েছে সাতটি গ্রাম। বালুটোলা এলাহিটোলা, সহবতটোলা, কালীটোলা, উত্তর হুকুমতটোলা, ঈশ্বরটোলা ও কামালতিপুর এই সাতটি গ্রামের প্রায় ২৫ হাজার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র পথ হল রিংবাঁধ। গত বর্ষায় গঙ্গার জল ফুলে উঠলে বাঁধে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়। রিংবাঁধের প্রায় ১০০ মিটার অংশ জলের তলায় চলে যায়। দেখা যায় বন্যার ভ্রূকুটি। রিংবাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে জল ঢুকতে শুরু করে ইংরেজবাজার ও মানিকচকের বিস্তীর্ণ এলাকায়। তবে তিনদিনের মধ্যে গঙ্গার জলস্তর কমতে শুরু করে। ফলে ওই বছরের মতো বন্যা পরিস্থিতির সম্ভাবনা কেটে যায়। কিন্তু বন্যা থেকে মানুষ বাঁচলেও রিংবাঁধ উন্মুক্তই থেকে যায়। এই উন্মুক্ত বাঁধের সংস্কার নিয়ে কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি সেচ দপ্তর বা মালদা জেলা প্রশাসনের। এভাবেই একটা বছর পেরিয়ে গিয়েছে।

আজও এলাহিটোলা রিংবাঁধ উন্মুক্তই থেকে গিয়েছে। তবে এতে প্রবল সমস্যায় পড়েন রিংবাঁধ সংলগ্ন সাতটি গ্রামের বাসিন্দারা। গতবছর এই উন্মুক্ত বাঁধের ওপর বাঁশের সাঁকো তৈরি করে চলাচলের পথ খুলে দিয়েছিলেন মানিকচকের বিধায়ক মোত্তাকিন আলম। তবে বাঁশের সাঁকোর স্থায়িত্ব বেশি দিনের হয়নি। মাস ছয়েকের মধ্যেই সেই সাঁকো পচে যায়। এলাকাবাসী ফের দুর্ভোগে পড়েন। বালুটোলা বা এলাহিটোলা এলাকার মানুষদের শোভানগর বা শান্তি মোড় আসতে হলে ঘুরপথে গোপালপুর হয়ে আসতে হচ্ছিল। একইভাবে সহবতটোলা, কালীটোলা, উত্তর হুকুমতটোলা, ঈশ্বরটোলা বা কামালতিপুরের মানুষদের শোভানগর দিয়ে ঘুরে গোপালপুরে যেতে হচ্ছিল। এই সমস্যা থেকে বাঁচতে গ্রামবাসীরা স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য সুলেখা বিবির কাছে ছুটে যান।

তাঁরা দাবি তোলেন, যতদিন না পর্যন্ত রিংবাঁধের সংস্কার হচ্ছে, ততদিন পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকেই বাঁশের সেতু তৈরি করে দিতে হবে। এই দাবি তাঁরা গোপালপুর গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান সীমা বিবির কাছেও রাখেন। কিন্তু কেউই তাঁদের দাবিতে কর্ণপাত করেননি বলে গ্রামবাসীদের অভিযোগ। শেষে গ্রামের যুবকরা নিজেরাই চাঁদা তুলে বাঁশের সাঁকো তৈরির উদ্যোগ নেন। চাঁদা তুলে, নিজেরা শ্রম দিয়ে সোমবার থেকে সাঁকো তৈরির কাজ শুরু করেন। বুধবার এই কাজ শেষ হয়েছে। স্থানীয় যুবকদের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন গ্রামবাসীরা। এলাহিটোলা গ্রামের বাসিন্দা হাঁসা বেওয়া বলেন, বাঁশের সেতুর জন্য বহুবার পঞ্চায়েত

সদস্য ও প্রধানকে বলা হয়েছে। কিন্তু তাঁরা মানুষের কোনও কাজ করেন না। বাধ্য হয়ে গ্রামের যুবকরা চাঁদা তুলে সাঁকোর কাজে হাত লাগায়। তার কাজ শেষ হওয়ায় আমাদের খুব ভালো লাগছে। আমাদের ঘুরপথে শান্তি মোড় বা শোভানগরে যেতে হচ্ছিল। এবার থেকে সরাসরি এই সাঁকো পার করেই যেতে পারব। গ্রামের যুবক মফিজুদ্দিন শেখ বলেন, পঞ্চায়েত সদস্যকে আমরা বহুবার সাঁকো তৈরির আবেদন জানিয়েছি। তিনি আমাদের প্রধানের কাছে পাঠিয়েছেন। আবার প্রধান বলছেন, পঞ্চায়েত সদস্য না বললে আমরা কাজ করতে পারব না। এভাবে বেশ কয়েকবার ঘুরপাক খাওয়ার পর নিজেরাই চাঁদা তুলে বাঁশের সেতু তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করি। আজ কাজ সম্পন্ন হল। এই সেতুর ফলে কমপক্ষে ২৫ হাজার মানুষ উপকৃত হলেন।

গ্রামবাসীদের তোলা অভিযোগ প্রসঙ্গে পঞ্চায়েত সদস্য সুলেখা বিবি বলেন, প্রধান আমাদের কথা শোনেন না। এর আগে নিজে উদ্যোগ নিয়ে মাটি ফেলার কাজ করিয়েছিলাম। কিন্তু সেই কাজের বিল পাশ করেননি প্রধান। এখন নিজের দায়িত্বে সাঁকো করলে সেই বিল যদি পাশ না হয়, তাহলে বিপদের মুখে পড়ব। এদিকে গোপালপুর গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান সীমা বিবি বলেন, এলাহিটোলার পঞ্চায়েত সদস্য কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। তারপর থেকেই আমাদের বিরোধিতা করে যাচ্ছেন তিনি। ওই এলাকার যে কোনও কাজের প্রস্তাব দেওয়ার কথা সেখানকার সদস্যের। তিনি যদি প্রস্তাবই না দেন, তবে আমি কীভাবে সাঁকো করার অনুমতি দেব? তাই আমরা এই কাজ করতে পারিনি।