বিএসএফ ক্যাম্পে বেগার খাটতে হয় ফুলমতিদের

157

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ:  নিজের জমি থেকে চাষ করে ফিরতে সময়ে একটু এদিক ওদিক হলেও শাস্তিস্বরূপ বিএসএফ ক্যাম্পে বেগার খাটতে হয় ফুলমতিদের। সীমান্তের কাঁটাতার জোড়া দেওয়া, ঝাঁট দেওয়া…। আঁচলের খুঁটে চোখের জল মুছতে মুছতে ফুলমতি বর্মন বলতে থাকেন, কাঁটাতারের ওপারে আমাদের সাত বিঘা জমি আছে। রোজ চাষ করতে যাই। এখন ধান পেকেছে। ধান কাটার কাজ করে ফিরতে কিছুটা দেরি হলেই জওয়ানদের হয়রানির মুখে পড়তে হয়। ক্যাম্পে গিয়ে বেগারও খাটতে হয় অনেক সময়।

শুধু ফুলমতিই নন,হেমতাবাদের নওদা গ্রামের বাসিন্দা বিমল সিংহের গলাতেও একই সুর,কাঁটাতারের ওপারে চাষ করতে যাওয়ার সময় গেটেও যেমন হয়রানি হয়, তেমন সমস্যায় পড়তে হয়ে ফেরার সময় একটু দেরি হলেই। ফসল কেটে নিয়ে আসতে ১০-১৫ মিনিট দেরি হলেই আমাদের ওপর শুরু হয় অত্যাচার। নিয়ে যাওয়া হয় বিএসএফের ছাউনিতে। সেই ছাউনির কাজগুলো আমাদেরকে দিয়ে বেগার করায়। কোনও তার যদি দুষ্কৃতীরা কেটে ফেলে তা আমাদেরকে দিয়ে জোড়া লাগায়, ঝাঁট দিতে হয়। আমরা যদি কোনওভাবে প্রতিবাদ করি তবে আমাদের আর জমিতে যেতে দেওয়া হয় না। বিকেল পাঁচটা থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। হাট থেকে বাড়ি ফেরার পথে আমাদের আটকে নানারকম জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। চোখরাঙানির সহ গালিগালাজও শুনতে হয়।

- Advertisement -

হেমতাবাদের মাকর হাটের বাসিন্দা সাবিনা বেগম আরও ভয়ংকর অভিযোগ করে বলেন, দিন পাঁচেক আগে আমার মেয়ে প্রসববেদনায় কাতরাচ্ছিল। মেয়েকে ভুটভুটিতে চাপিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলাম। বিএসএফ জওয়ানরা পথ আটকে হাজারো প্রশ্ন করেন। তাঁদের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতেই ভুটভুটিতে মেয়ে প্রসব হয়ে যায়। ভাটোলের ভাতুন গ্রাম পঞ্চায়েতের বসতপুরের বাসিন্দা মাজেদা বিবি বলেন, বিএসএফের মন মতো কাজ করলে তবেই নিজের জমি চাষ করার অনুমতি পাওয়া যায়।

হ্যাঁ এমনই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন উত্তর দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী গ্রামের বাসিন্দারা। হেমতাবাদ ব্লকের চৈনগর, বিষ্ণুপুর এবং নওদা পঞ্চায়েতের সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা দিয়ে কাঁটাতার রয়েছে। ওপারে বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষা অনেক কৃষিজমি ভারতীয়। এপারের বাসিন্দারা ওইসব কৃষিজমির মালিক। এক্ষেত্রে বিএসএফকে চটালে সীমান্তের বাসিন্দাদের সমস্য বাড়বে। তাই পেটের দায়ে কষ্ট সয়ে চুপ করে থাকতে বাধ্য হন সীমান্তবাসীরা।

এখন সোনালি আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। সকাল সকাল উত্তর দিনাজপুরের সীমান্তের কৃষক পরিবারের লোকজনেরা ওপারের ভারতীয় কৃষিতে উৎপাদিত ফসল কাটতে ঘোর ব্যস্ত। কিন্তু সীমান্তের কাঁটাতারের ওপারে ভারতীয় কৃষিজমির মরশুমি পাকা ধান কাটতে গিয়ে এভাবেই বিএসএফের নিয়ত চোখরাঙানির জেরবার এপারের অসহায় সীমান্তবাসীরা। তারওপর ১৫ কিলোমিটারের বদলে সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটার বিএসএফের আওতায় তুলে দেওয়ার আলোচনা নিয়ে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের চাপানউতোর চলছে। এখনও কোন চূড়ান্ত রফা সূত্র বের হয়নি। রোজ  ঘড়ির কাঁটা মেপে তিনবার ওপারে থাকা নিজেদের আবাদি জমিতে যাওয়া আসার অনুমতি মেলে।

সীমান্তবাসীরা জানিয়েছেন, রোজ সকাল আটটা, দুপুর বারোটা এবং বিকাল চারটা। এই নির্দিষ্ট সময়ের পর সীমান্তের গেট দিয়ে যাওয়া আসা পথ বন্ধ হয়ে যায়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ওপার থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে কাঁটাতারের ওপারেই অপেক্ষা ছাড়া অন্য কোনও বিকল্পপথ আপাতত খোলা নেই কৃষকদের। হেমতাবাদ থানার পুলিশ সূত্রে জানানো হয়, সীমান্ত থেকে ১৫ কিলোমিটার বিএসএফের আওতায়। বাকি এলাকা রাজ্য পুলিশের অধীনে। আবার মালন সীমান্তের কমান্ডেন্ট জানিয়েছেন, সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটার এলাকা এখনই বিএফএফকে দেওয়া হয়নি।