ভোটের চিন্তা যেন অনেক পিছনে বাংলাদেশ সীমান্তে

161

রূপায়ণ ভট্টাচার্য, গিতালদহ : পাথরের মাইলস্টোনে লেখা গিতালদহ ০। তাহলে এসে গিয়েছি বাংলাদেশ সীমান্তের গিতালদহে। উৎসাহিত হয়ে ছবি তুলতে গেলে দূর থেকে বিরক্তির হাঁক দেন সীমান্তের জওয়ান, হাত নাড়েন। সাফ ইঙ্গিত, একদম ছবি তুলবেন না।

বাংলার মানচিত্রে একবারে পূর্ব-দক্ষিণ প্রান্তের শেষ বিন্দু ধরে নেওয়া যাক। ইংরেজি টি অক্ষরের মতো জায়গাটা। দিনহাটা থেকে বড় রাস্তা গিয়ে যেখানে ধাক্কা খেয়েছে, গিতালদহের সেই গ্রামের নাম বুকে গেঁথে রাখার মতো। ভোরাম পয়স্তি। সেখানে ঘোষবাবুর বড় দোকান বহুবছর হল। অতি ছোটখাটো জিনিসপত্রের সঙ্গে দোকানে একটা জেরক্স মেশিন দেখে কৌতূহল জাগে, এই সীমান্তবর্তী গ্রামে এমন মেশিনের কী দরকার।

- Advertisement -

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে কৌতূহল মেটে। ভারতের শেষ প্রান্ত এখান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার। কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিএসএফ রক্ষীদের কাগজপত্র না দেখিয়ে ঢোকা যাবে না। ভোরাম পয়স্তি গ্রামে কারও বাড়িতে অচেনা অতিথি এলে, তাঁকে এসে নিয়ে যেতে হবে বাসিন্দাদের। স্থানীয় এক টোটোচালক বসেছিলেন ফাঁকা গাড়ি নিয়ে। তাঁর সওয়াররা কাগজ জেরক্স করাতে ঘোষদের দোকানে। চালকের মুখে গজগজানি, জানেন তো, এইসব ঝামেলার জন্য আমি গিতালদহে আসতেই চাই না। নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। ঠিকানা জেরক্স করাতে হয়। আমার বাড়ি কাছেই। তবু আসতে চাই না।

প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বিএসএফের বেশ বড় অফিস। কিন্তু এখানেই একপ্রস্থ পরীক্ষা চলবে। গ্রামের বাসিন্দারা দিনহাটার বাজার থেকে জিনিসপত্র আনলে ব্যাগ খুলে দেখবেন এক সেনা। তারপর যেতে দেওয়া। পাশের ডানদিকে এক তরুণী লাউয়ের খেতে কাজ করছেন। সেদিকেও যেতে দেবেন না জওয়ানরা। ভারতে থেকেও এই গ্রামের লোকেরা যেন বাইরের। পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ভোটের বাতাস এখানে ঢোকে না। বিএসএফ ক্যাম্পের পিছনে সিঙ্গিমারি নদী। অনেকে বলেন ধরলা। জলঢাকার এই শাখা নদীটাই এখানে কিছু জায়গায় আসল সীমান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার পরেও রয়েছে দুটো বড় ভারতীয় গ্রাম বাঁশুয়া খামার ও দরিবশ। গ্রামের একেবারে গায়ে বাংলাদেশ।

এখন জলঢাকার শেষদিকের জলস্রোত জলহীন। সীমান্ত তৈরি করে চলে গিয়েছে অনেকদূর। এখন হেঁটে চলে যাওয়া যায় ওপারে। বর্ষার সময় নৌকো ভরসা। বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁদের মনের টান বেশি থাকলে দোষ দেওয়া যাবে না। সেখানে বাংলার ভোটের নগণ্য আলোও পৌঁছোবে কী করে? সীমান্তের তিন কিলোমিটার দূরে কোনও পার্টির পোস্টার বা পতাকার চিহ্ন পাওয়া যায় না। এলাকায় ভোটের বদলে কী নিয়ে চর্চা চলে তা হলে? গোরু, গয়না বা একজাতীয় নেশার সিরাপ। আজও যেসব নজর এড়িয়ে এপার থেকে পাচার হয় মাঝে মাঝে। ওপার থেকে বেশি আসে তরিতরকারি।

গিতালদহ পৌঁছানোর ঠিক আগে বাঁদিকে, রাস্তায় চলার দোকানগুলোর আড়ালে চলে গিয়েছে কাস্টমসের ব্যারাক। গিয়ে দেখা গেল, একেবারে ভাঙাচোরা পরিত্যক্ত গোটা চারেক বিল্ডিং। রাতে অবধারিত বাজে লোকদের আস্তানা হয়ে ওঠে। সেখানে একটা বড় গাড়ি পড়ে রয়েছে। গাছ জন্মে গিয়েছে গাড়িতে। নিরাপত্তারক্ষীর কাছে জানা গেল, বছর পাঁচ-ছয় আগে এই গাড়ি ভর্তি গোরু নিয়ে পালাচ্ছিলেন এক ভদ্রলোক। কাস্টমসের নজরে পড়ে তিনি পালান গোরু ফেলে আর ফিরে আসেননি। কমপ্লেক্সের কেয়ারটেকার চন্দন হরিজন এখন ভয়ে ভয়ে থাকেন, মাঝে মাঝে ঘরগুলোতে অজানা লোক ঢুকে পড়ে বলে।

তারকাঁটার বিস্তৃত প্রাচীর এবং কড়া নজরদারির সৌজন্যে অবশ্য কিছুটা কমেছে চোরাচালান। কাস্টমসের অফিসও গিতালদহ থেকে চলে গিয়েছে আরও দক্ষিণে চ্যাংরাবান্ধায়। সেখান দিয়ে স্টোনচিপস বোঝাই অজস্র ট্রাক যায় বাংলাদেশে। চ্যাংরাবান্ধায় প্রায় ঘরে ঘরে ট্রাক। সোনা হয়ে উঠেছে স্টোনচিপস। সংকোশ, রায়ডাক, বালাসন, তিস্তা, মহানন্দা থেকে তুলে আনা স্টোনচিপস।

দিনহাটা শহরের সংহতি ময়দানে গত কয়েকদিন ধরে বড় সভা লেগেই ছিল। একদিন তৃণমূলের, একদিন বিজেপির। উলটো দিকে, রাস্তার পাশে দিনহাটার কিংবদন্তি ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা কমল গুহের বিশাল স্মৃতিস্মারক। বাংলার কোনও শহরে এমন ভূমিপুত্র নেতার এত বড় স্মৃতিসৌধ আছে কি না সন্দেহ। মালদায় গনি খান পর্যন্ত এমন স্মৃতিস্তম্ভ পাননি। দিনহাটা শহর ঘুরে চোখে পড়ল, মৃত্যুর ১৪ বছর পরেও এক প্রার্থীর ব্যানারে কমল গুহের ছবি। তাঁর নামে ভোট টানার চেষ্টা। যদিও কমলবাবুর ছেলে উদয়নই তৃণমূলে।

তা কমলের আমলের ভোটের গিতালদহের সঙ্গে উদয়নের আমলের গিতালদহের মূল ফারাক কোথায়? রাস্তাঘাট অসাধারণ ঝকঝকে মসৃণ, আগে যা কল্পনাতেও ছিল না। ইন্টারনেট ব্যবস্থা অনেক ভালো। এখানেও তরুণরা সবাই ঝুঁকে থাকে মোবাইলে, সিগন্যাল এল কি না। কিন্তু সীমান্তের দিকে গ্রামবাসীদের সঙ্গে সীমান্তরক্ষীদের চোর-পুলিশ খেলা বন্ধ হয়নি। বন্ধ হয়নি রক্ষীদের চোখরাঙানো। গ্রামের ভিতরে এখনও বিস্তৃত মেঠোপথ। ভোট দিতে এখনও ভোগান্তি। কালিম্পংয়ে গরুবাথানের কোনও পাহাড়ে দুটো পাহাড় টপকে এক ঘণ্টা হেঁটে যেতে হয়। সীমান্তের সমতলেও কম দুর্ভোগ নেই।

গিতালদহের বহু স্মৃতিতাড়িত রেললাইন গিতালদহের রাস্তায় মাঝেমাঝেই উঁকি মারে। স্বাধীনতার আগে রংপুরের পার্বতীপুর থেকে কাটিহার পর্যন্ত ট্রেন চলত গিতালদহ হয়ে, পরে অসম থেকে কাটিহারও চলত। গিতালদহের পুরোনো স্টেশনের বদলে এখন দাঁড়িয়ে রয়েছে নিউ গিতালদহ স্টেশন। ভোটের বাজারে কোচবিহার, দিনহাটা, মাথাভাঙ্গা, মেখলিগঞ্জের অনেক নেতা উসকে দিচ্ছেন ওপার বাংলার লালমনিরহাট স্টেশনের স্মৃতি।

সীমান্ত এলাকার মানুষ লালমনিরহাটের স্মৃতি নিয়ে কী করবেন? পেটের খিদে স্মৃতির থেকে অনেক অনেক বড়?  ভোটের রমরমা বাজারেও অনেকে রেশনের চাল-আটা নিয়ে তার বদলে কিনে আনেন তরকারি, তেল, নুন। কারও কাছে টাকা নেই বলে তরকারির বদলে কারও কাছে বিক্রেতা নেন রেশনের চাল বা আটা। তা বেচে টাকা পান। মাস কয়ে আগেও লকডাউনের সময় এই শতাব্দী পুরোনো বিনিময় প্রথা দেখা গিয়েছে গিতালদহে নদীর ওপারের গরিব গ্রামগুলোতে। কোনও উপায়ান্তর না দেখে। কেন্দ্র ও রাজ্য, কেউ তাঁদের কথা ভাবেনি। এসব মাথায় রেখেই এবার ভোটের বুথে পা বাড়ানো সীমান্তঘেঁষা গ্রামের মানুষগুলোর। বুথের ভিতরে ভোট দেওয়ার সময় কোনও নেতা থাকবেন না, সীমান্তরক্ষীরাও না। বাতাসে অনেক মুক্তি ও স্বাধীনতার গন্ধ তখন।