রেজাউল হক, পুরাতন মালদা :  গ্রামে যাতায়াতের মাধ্যম বলতে টাঙন নদীর ওপর একটি মাত্র জরাজীর্ণ বাঁশের অস্থায়ী সাঁকো। এমন বেহাল যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য এই গ্রামে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতে চান না অন্য গ্রামের বাসিন্দারা। হবে নাই বা কেন! এই গ্রামে আজ পর্যন্ত চারচাকার কোনো গাড়ি ঢোকেনি। কোনোদিন পৌঁছায়নি দমকল, অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশের মতো জরুরি পরিসেবার গাড়ি। মুমূর্ষু রোগীদের বাঁশের মাচায় করে নিয়ে যেতে হয় হাসপাতালে। সব মিলিয়ে বেহাল যোগাযোগ ব্যবস্থা যেন অচেনা শব্দ শিবগঞ্জ বিধানগড় গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে।

পুরাতন মালদা ব্লকের মুচিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের টাঙন নদীর এক পাড়ে রয়েছে শিবগঞ্জ বিধানগড় গ্রাম। অন্য পাড়ে চরলক্ষ্মীপুর, কৈলাসপুর সহ আরো বেশ কিছু গ্রাম। সমস্যাটা মূলত শিবগঞ্জ বিধানগড় গ্রামের। এই গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় তিন হাজার। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো জায়গায় থেকে এই গ্রামের মানুষদের জীবন-জীবিকা চালাতে হচ্ছে। শিবগঞ্জ বিধানগড় গ্রামে যাওযার জন্য অনেকদিন আগে গ্রাম পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে টাঙন নদীর ওপর বাঁশ ও চাটাই দিয়ে অস্থায়ী একটি সাঁকো তৈরি করা হয়েছিল। এখনও সেই ব্যবস্থাই রয়েছে। পায়ে হেঁটে এই সাঁকো পেরিয়ে গ্রামের মানুষকে এপারে আসতে হয়। কারণ, আধুনিক ব্যবস্থার সবকিছুই তো এপারে। শুধু তাই নয়, হবিবপুর ব্লকের বুলবুলচণ্ডী গ্রাম পঞ্চায়েতের ডোবাপাড়া হয়ে অন্তত ১১ কিলোমিটার ঘুরপথে যেতে হয় শিবগঞ্জ বিধানগড় গ্রামের বাসিন্দাদের। ওই গ্রামে একটি প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু নেই কোনো উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র। বাজার-হাট থেকে যাবতীয় কাজকর্ম গ্রামবাসীদের জরাজীর্ণ সাঁকো পেরিয়ে মুচিয়ায় এসে করতে হয়।

ভুক্তভোগী গ্রামবাসী শর্বরী দাস বলেন, এই সেতু দীর্ঘদিন আগেই তৈরি হয়েছে। মোটরবাইক তো দূরের কথা, এই সেতু দিয়ে একটা সাইকেলও ঠিকমতো পার হতে পারে না। গ্রামে কোনোদিন অ্যাম্বুলেন্স আসেনি। পুলিশের গাড়ি, দমকল তো চিন্তাভাবনার বাইরে। মুমূর্ষু রোগীদের খাটিয়ায় চাপিয়ে নিয়ে যেতে হয় নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে । পাকা সেতু হলে গ্রামবাসীদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে। শুধু তাই নয়, এই এলাকায় পাকা সেতু হলে মুচিয়া থেকে হবিবপুর ব্লকে যাওয়ার ক্ষেত্রেও গ্রামবাসীদের  সুবিধা হবে। উপকৃত হবে কয়েক লক্ষ মানুষ। একই বক্তব্য ধনঞ্জয় সরকার, অবনী জোয়ারদার, ধীরেন মণ্ডলদেরও।

গ্রামবাসীদের অভিযোগ, গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে গ্রামে এসে বিভিন্ন দলের নেতারা বিষয়টি ভেবে দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। লোকসভা নির্বাচনেও একই প্রতিশ্রুতি মিলেছিল। কিন্তু নির্বাচন শেষ, প্রতিশ্রুতির বাজনাও মিলিয়ে গিয়েছে। শুধু সেতুর সমস্যাই নয়, রাস্তা, পানীয় জল সহ সবকিছুতেই এখানে চরম সমস্যা রয়েছে। পরিস্রুত পানীয় জলের অভাবে গ্রামবাসীদের দূষিত জল পান করতে হয়। কাঁচা রাস্তায় বর্ষাকালে চলাচল করা যায় না। একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো এই গ্রামের মানুষদের বসবাস করতে হচ্ছে। বিধানগড় গ্রামের পঞ্চায়েত সদস্য নীলিমা সেন বলেন, আগাগোড়াই এই গ্রামটি অনুন্নত। পাকা সেতুর ব্যাপারে পঞ্চায়েতের করার কিছু নেই। তবে এলাকায় পানীয় জল ও পাকা রাস্তার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মুচিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান লক্ষ্মী গাইন বলেন, পাকা সেতুর বিষয়টি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে। পঞ্চায়েতের সীমিত ক্ষমতা। তবে ওই গ্রামে পানীয় জল এবং রাস্তার বেহাল অবস্থার সমস্যা মেটানোর জন্য প্রযোজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পুরাতন মালদার বিডিও ইরফান হাবিব জানিয়েছেন, পাকা সেতুর দাবির বিষয়টি শুনেছি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্রামের অন্যান্য সার্বিক পরিসেবা উন্নয়নের ওপর জোর দেওযা হচ্ছে।