বিতর্কের জেরে বাতিল বিশ্বভারতীর আলোচনা সভা

117

কলকাতা: রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব বিধানসভা ভোটে হারের কারণ এখনও বিশ্লেষণে না নামলেও এই নিয়ে আলোচনা সভা আয়োজনের সমস্ত ব্যবস্থা করে ফেলেছিল বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বভারতীর উদ্যোগে এই আলোচনা সভার কথা ছড়িয়ে পড়তেই রাজ্যজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। এর জেরে বাতিল হয়েছে বিশ্বভারতীর আলোচনা সভা। আর এতে ফের একবার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন উপাচার্য বিদ্যুত চক্রবর্তী।

এর আগেও উপাচার্যের বিভিন্ন কাজকর্ম নিয়ে সমালোচনায় সরব হয়েছেন প্রবীণ আশ্রমিক থেকে পড়ুয়া, সকলেই। হঠাৎ করে বিশ্বভারতীর মতো কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজ্যে বিজেপির হারের বিশ্লেষণ নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন কী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। উপাচার্য বিদ্যুত চক্রবর্তীর প্রতিক্রিয়া জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। বিশ্বভারতীর কোনও পদস্থ কর্তাও এই নিয়ে মুখ খুলতে চাননি। তবে উপাচার্যের এই সিদ্ধান্তে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রবীণ আশ্রমিকরা। এই তুমুল বিতর্ক শুরু হওয়ার পরই পিছু হটেছেন বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। এদিন বিকেলেই বিজ্ঞপ্তি জারি করে এই আলোচনা সভা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।

- Advertisement -

বিশ্বভারতীর লেকচার সিরিজে ৩৫ তম লেকচারের বিষয়বস্তু রাখা হয়েছিল, হোয়াই বিজেপি ফেইলড টু উইন ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যাসেম্বলি ইলেকশন। ১৮ মে বিকাল ৪টেয় ভার্চুয়ালি এই আলোচনা সভায় যোগ দেওয়ার জন্য সকলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বক্তা ছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি আয়োগের যুগ্ম উপদেষ্টা তথা ডিরেক্টর অফ সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ ডেভেলপিং সোসাইটিস (সিএসডিএস) প্রাক্তন ডিরেক্টর অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার। বিশ্বভারতীর উপাচার্য বিদ্যুত চক্রবর্তীর ওই অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করার কথা ছিল। বুধবার সকালেই বিশ্বভারতীর পক্ষ থেকে এই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। তারপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিশ্বভারতীর আশ্রমিকরা ছাড়াও রাজ্যের বহু বিদ্বজ্জন মুখ খুলতে শুরু করেন। বিশ্বভারতীকে রীতিমতো বিজেপির পার্টি অফিস তৈরি করা হচ্ছে বলে অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে অভিযোগ তোলেন। ফেসবুক, টুইটারে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা ঝড় সুনামি হয়ে ওঠার প্রাক্কালেই বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।

উপাচার্যকে ঘিরে বিতর্ক এই প্রথম নয়। বরং তিনি প্রথম থেকেই বিতর্কিত। ২০০৭ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন তাঁকে ঘিরে যৌন হেনস্থার অভিযোগ উঠেছিল। বিশ্বভারতীতে যোগ দেওয়ার পরে কখনও পাঁচিল দেওয়া নিয়ে কখনও পূর্ত দপ্তর থেকে পাওয়া জমিতে রাস্তার ওপর দিয়ে সাধারণ মানুষের যাতায়াত বন্ধ করার মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে তুমুল বিতর্কের মধ্যে পড়েছেন উপাচার্য। তখনও তিনি প্রথমে নিজেদের জেদে অনড় থাকলেও পরে সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হন। তাঁর কিছু সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আশ্রমিকরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন। এবারও বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়ল না। বিশ্বভারতীর এই বিজ্ঞপ্তি জারির পরই উপাচার্যকে নিশানা করে ক্ষোভ জানান প্রবীণ আশ্রমিকরা।

বিশ্বভারতীর প্রাক্তন উপাচার্য সবুজকলি সেন বলেন, ‘বিশ্বভারতীর মতো একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনার বিষয়বস্তু এটি হতে পারে না। বিশ্বভারতীর মর্যাদা ও সুনাম এর ফলে চরম নষ্ট হচ্ছে। যেভাবে এখন বিশ্বভারতীকে চালানো হচ্ছে, তা কবিগুরুর ভাবধারার পরিপন্থী।’ আরেক প্রবীণ আশ্রমিক সুপ্রিয় ঠাকুর বলেন, ‘বিশ্বভারতীর মর্যাদা অনেক ওপরে। সেই মর্যাদায় আঘাত হানা কেউই পছন্দ করবেন না। বিশ্বভারতীতে রাজনীতি একেবারেই ছিল না। কবিগুরু রাজনীতি পছন্দ করছেন না। কিন্তু সেই আদর্শকে মানা হচ্ছে কই? যিনি বিশ্বভারতী চালাচ্ছেন, তিনি রাজনীতি করতে চাইলে কী করা যাবে? অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা।’

বিদ্যুত চক্রবর্তী উপাচার্য হয়ে আসার পর থেকেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। বীরভূম জেলা তণমূলের সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল বলেছেন, ‘উপাচার্য যিনি আছেন, তিনি আদৌ কবিগুরুর আদর্শ, ভাবধারা সম্পর্কে কিছু জানেন না। উনি আরএসএস করেছেন। বিশ্বভারতীকে ধর্মীয় আখড়ায় পরিণত করতে চাইছেন। কিন্তু ওঁকে মনে করিয়ে দিতে চাই, বিশ্বভারতীর সম্মানহানি বাংলার মানুষ মেনে নেবেন না। এর যোগ্য জবাব ওঁকে পেতে হবে।’ বামপন্থীরাও এই আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। চারদিকে ক্ষোভ-বিক্ষোভের মুখে পড়ে বিকেলে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় বিশ্বভারতী। এই আলোচনা সভা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।