মিল-অমিলের নাটকে বাংলা ও অসমের ভোট

50

রূপায়ণ ভট্টাচার্য, বক্সিরহাট : হাট বসেছে শুক্রবারে, বক্সিরহাটে সংকোশ পাড়ে। হাট মানে শুধু গোরুর হাট। অজস্র গোরু বেচাকেনা চলে অসম লাগোয়া বক্সিরহাটে। ভোট নিয়ে কথা বলতে গেলে সেখানে মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে মানুষের আকারে-ইঙ্গিতে। এই ভোট ভাগ করে দিয়েছে মানুষকে, সম্প্রদায়কে। হাটে উপস্থিত হিন্দু ক্রেতাদের অধিকাংশের সতর্ক মন্তব্যের আড়াল-আবডাল ঘুরে উঠে আসছে বিজেপির কথা, তৃণমূলের স্থানীয় নেতাদের দুর্নীতির কথা। মুসলিম ক্রেতাদের মুখে আবার মমতার সাহসের প্রশংসা সাম্প্রদায়িকতার বিষ রোখার জন্য।

কোচবিহার জেলার অসম সীমানার শহর বক্সিরহাটে এই হাটটা বড় বিস্ময়জাগানিয়া। পিছনের কিছু বাড়ি বাংলার, কিছু বাড়ি অসমের। এত গায়ে গায়ে যে, বোঝা কঠিন কোন বাড়িটা কোন রাজ্যের জমিতে। হাটে কয়েকজনের গলায় অসমের বহুপরিচিত সাদা উত্তরীয় দেখে বোঝা যাচ্ছে, তাঁরা অসমের। ধুবড়ি থেকে পর্যন্ত মানুষ নিয়মিত আসেন এখানে কেনাবেচা করতে। মৌমাছির টাটকা বিশাল চাক নিয়ে মধু বিক্রি করতে এসেছেন একজন। তিনিও অসমের বাসিন্দা।

- Advertisement -

বক্সিরহাটে হাটের পিছন দিকে বাজার পেরিয়ে মাড়োয়ারিপট্টি। সেখানে একদিকে বেশ কিছু বন্ধ পাটের ছোট কারখানা। একটা সময় বক্সিরহাটে এইসব কারখানায় কাজ করতে আসতেন অসমের অজস্র মানুষ। এখন অসমের ওদিকে পাট কারখানা হয়ে যাওয়ায় তাঁরা আর বাংলায় আসেন না। এদিকের অধিকাংশ পাট কারখানা বন্ধ করে চলে গিয়েছেন অনেক মাড়োয়ারি। মাড়োয়ারিপট্টি নামটা শুধু থেকে গিয়েছে। বাংলাজুড়ে এখন পাটশিল্পে বিপর্যয়। পাটচাষে আগ্রহী নন কৃষকরা। এককালে তামাক আর পাটের জন্য বিখ্যাত কোচবিহারও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে পাট থেকে। বরং বছর পাঁচেক আগে থেকে খেতে সেই জায়গা নিয়েছে ভুট্টা। তুফানগঞ্জ থেকে মেখলিগঞ্জ পর্যন্ত এখন উপচে পড়ে ভুট্টাখেত। ভোটের চর্চায় পাটশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতারা মিথ্যা প্রতিশ্রুতিও আর দেন না। এতটাই খরচের খাতায় এখন পাট।

মাড়োয়ারিপট্টির পথ দিয়ে যেতে যেতে আরও বিস্ময়। রাস্তাটা হঠাৎ খুব সামান্য ঢালু হয়ে আবার উঠে গিয়েছে। বড় জোর দুফুট। ওটা পেরোলেই অসম সীমানা। নীচু হয়ে যাওয়া সামান্য ঢালটা ছিল এককালে সংকোশ নদীর নালা। বাঁদিকে একটা পোস্ট অফিস। সেখানে বাংলার কোনও অস্তিত্ব নেই। হিন্দি ও ইংরেজির সঙ্গে অসমিয়া ভাষায় লেখা গ্রামের নাম। একবার ছোটগুমা, অন্যবার চটুগুমা। গ্রামটি ছোট হলেও একটু বেশিই সাজানো টিনের চালের বাড়িগুলো, রাস্তাটাও। পাশের দোকানগুলোতে কথা চলছে সব বাংলায়। স্বপন পাল নামে এক মধ্যবয়স্ক বেশ গুছিয়ে কথা বলেন। কয়েক যুগ হল অসমের সীমানার গ্রামে থাকে তাঁর পরিবার। অকপট বলে দিলেন, বাড়িতে দুপুরে আর রাতে খেতে আসা ছাড়া আমাদের সব কাজকর্ম বাংলায়। ওখানেই ওঠাবসা। আমরা প্রথম থেকে অসমে। কিন্তু আমাদের সব ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে কোচবিহারে। দুপা ফেলে অসম ছেড়ে বাংলায় যাচ্ছিলেন তরুণ শম্ভু সাহা। তাঁর সাফ কথা, ওপারে সবকিছু বিষয়ে আড্ডা দিই। শুধু রাজনীতি নিয়ে ভুলেও কথা বলি না। স্বপনবাবুরও একই ভাবনা। বাংলায় সব কিছুতে রাজনীতিকরণ, রাজনীতি নিয়ে মারপিট অবশ্য মারাত্মক অপছন্দ তাঁর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সর্বানন্দ সোনোয়ালের কাজের মধ্যে ফারাকটা কী? তুলনায় না গিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা, মমতা বেশ কিছু ভালো কাজ করেছেন। কিন্তু আশপাশের লোকগুলো ওঁকে ডুবিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের এখানে কাজ করতে গেলে স্থানীয় নেতাদের এভাবে টাকা দিতে হয় না।

বক্সিরহাটের অন্য প্রান্ত দিয়ে হাইওয়েতে উঠতে গেলে সীমানা পালটে যায়। সীমানা তখন একটা ছোট্ট সেতু। নীচে সংকোশ নদী থেকে ছিটকে আসা একটা সরু খাল। বাংলার দিকে একটা মাঠ, একটা ছোট মন্দির। একটা শিবমূর্তি পড়ে রয়েছে খালের ধারে, গাছের নীচে। রাস্তা ধরে ক্রমশ গৌরীপুর ও ধুবড়ির দিকে এগোলে বাংলা ও অসমের নির্বাচনি পরিবেশের মিল এবং অমিল স্পষ্ট হয়ে ওঠে আরও। জাতীয় সড়কে কয়েক মাইলের ফারাকে সেদিন ছিল অসম বিজেপি এবং বিরোধী জোটের বড় সভা। অজস্র লোক। আগমনী নামে একটা গ্রামে জোটের সভায় মুসলিমদের ভিড়। গঙ্গাধর নদীর একেবারে ধারে, ব্রিজের গায়ে শিব-কালী মন্দির। সেখানে আবার উপচে পড়ছে হিন্দুরা। দুই সভায় শ্রোতাদের অধিকাংশ বাংলাভাষী।

তৃণমূল সমর্থকরা তপ্ত হতে পারেন একটা দৃশ্য দেখলে। অসমের রাস্তাতেও খেলা হবে গান চালিয়ে জোট সমর্থকদের গাড়িগুলো চলছে। শুধু চিৎকার বা স্লোগানে কোথাও মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি নেই। বিকট উল্লাস নেই। সত্যিই খেলা খেলা পরিবেশ। ধুবড়ি শহর ওরকমই শান্ত। মাইকের দাপাদাপি নেই। রাস্তার দেওয়ালে কিছু পোস্টার ছাড়া মনে হচ্ছে না যে, দোরগোড়ায় ভোট। এদিনও দেখা গেল, কিছু পোস্টার লাগানো চলছে। শহরের পরিচিত বাঙালি ডাক্তার দেবময় সান্যাল বিজেপি প্রার্থী। তাঁর বাড়ি লাগোয়া অফিসে খুব ভিড়। কিন্তু হইচই নেই।

সর্বানন্দ সোনোয়াল সরকার থাকলে, মুসলিম অধ্যুষিত কাছাড়ে তৃতীয়বারের চেষ্টায় জিতলে মালদার জামাই দেবময় অসমের মন্ত্রী হতে পারেন। কিন্তু কঠিন কাজটা আদৌ সম্ভব কি? দেবময় সেদিন যাচ্ছেন ব্রহ্মপুত্রের চরে প্রচার করতে। গলায় বাড়তি আত্মবিশ্বাস, কংগ্রেসের অনেক সমর্থক জোটের প্রার্থীতে খুশি নন। তাঁরা আমার পাশে। ওঁরা বুঝেছেন, বিজেপি আর অসমে সাম্প্রদায়িক পার্টি নয়। এবার আমি জেতার ব্যাপারে আশাবাদী। বললেন বটে, কিন্তু তাঁর ঘনিষ্ঠ অনেকে ক্ষুব্ধ বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মার মন্তব্যে। যার ফলে খেপে গিয়েছেন মুসলিম ভোটাররা।

বাঙালি ও অসমিয়া ভোটারদের মধ্যে মূল ফারাক চোখে পড়ল একটাই। এরাজ্যে ভোট নিয়ে কথা বলতে গেলে অধিকাংশ লোকে মাত্রাতিরিক্ত সতর্ক, ওরাজ্যে অনেক বেশি খোলামেলা। কোন পার্টিকে কেন ভোট দেবেন, বুঝিয়ে দিতে কার্পণ্য করছেন না অসমিয়ারা। বহু আলোচিত হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গেও অকপট তাঁরা। অসম সীমান্তের মতো সিতাইয়ে বাংলাদেশ সীমান্তেও অধিকাংশ বঙ্গ ভোটারের মুখে তালা। অসমে নিরাপত্তা নিয়ে অত কড়াকড়ি নেই। বাংলার রাস্তায় নাকা চেকিং অনেক বেশি তুলনায়। পুলিশেরও যেন ভোটারদের মতো বেশি ভয়।

আসল ভয়ে কারণটা বাস্তবে কী? পুলিশও নয়, ভোটারদের সতর্কতাও নয়। আসল ভয়, দুটো রাজ্যেই একইভাবে ভোটারদের সাম্প্রদায়িক ভাবনার সওয়ার হয়ে ওঠা।