পঙ্কজ মহন্ত, বালুরঘাট : দেশজুড়ে স্বচ্ছ ভারত অভিযান কিংবা নির্মল বাংলা নিয়ে যখন রাজ্য জুড়ে চলছে সচেতনতার প্রচার, ঠিক সেই সময়ে দাঁড়িয়ে আবর্জনায় জেরবার হওয়ার ছবি ফুটে উঠছে বালুরঘাটে। বালুরঘাট পুরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সুকান্ত সরণি সহ আরসিডি গার্লস স্কুল ও সংকেত ক্লাবের রাস্তাতেও জমে থাকছে আবর্জনার স্তূপ। দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকার একটি বিরাট অংশ জুড়েই ছড়িয়ে থাকছে আবর্জনা। স্থানীয় বাসিন্দা দিগন্তকুমার বিশ্বাস অভিযোগ করেন, রাস্তার ধারে জমে থাকা আবর্জনার ফলে রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করা দুষ্কর হয়ে উঠেছে। আবর্জনা পচে গন্ধ ছড়াচ্ছে।

ক্ষুদিরাম স্কুল থেকে একটু এগিয়ে বাড়ি তারাপদ সরকার, গৌর সরকারদের। তাঁরা জানালেন, আমাদের পাড়ায় প্রায় প্রতিদিন সকালেই হুইসেল বাজানো আবর্জনার গাড়ি আসে। কিন্তু তা সত্ত্বেও চৌমাথায় রাস্তাগুলির মুখে কেউ বা কারা বাড়ির এঁটোকাঁটা, সবজির খোসা, পলিথিন ব্যাগ, রান্নার উচ্ছিষ্ট, ব্যবহার করা স্যানিটারি ন্যাপকিন ফেলে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই দু-একদিন পরে তা থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। এছাড়া আবর্জনা রাস্তায় চলে আসার ঘটনা তো নিত্যদিনের। ফলে সেখানে দুর্ঘটনা ঘটাও অস্বাভাবিক নয়। এই আবর্জনা পরিষ্কার করে পুরসভার ট্র‌্যাক্টর। কিন্তু সেই ট্র‌্যাক্টরও প্রতিদিন আসে না।

- Advertisement -

স্থানীয় বাসিন্দা ফণী সরকার জানান, কালীপুজোর কয়েদিন ধরে এখান থেকে নোংরা জমছে এবং তা এখনো আছে। রথতলা এলাকার বাসিন্দা পাঞ্চালী ভট্টাচার্য বাগচী বলেন, ত্রিতীর্থ প্রেক্ষাগৃহের পাশে এলআইসি অফিসের উলটো দিকের গলিতে ঢোকার মুখেই প্রতিবেশীরা তাঁদের বাড়ির যাবতীয় নোংরা ফেলেন। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারেই তাঁরা এসব কাণ্ড ঘটান যাতে কেউ দেখতে না পান। আমার সদর দরজার সামনে এখনও মাঝেমাঝে কেউ আবর্জনা ফেলে যান। আমি বহুবার প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু তাতে কোনো সুরাহা হয় না।

পাঞ্চালীদেবী আরও জানান, এর পাশাপাশি গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো রয়েছে নর্দমায় ত্রুটি। ফলে বাড়ির সামনে দিয়ে জল যায় না। আবদ্ধ জল মশার ডিপো হয়ে রয়েছে। পুরসভার সাফাইকর্মীরা এসে দেখে যান, কিন্তু পরিষ্কার হয় না। নিয়মিতভাবে স্বাস্থ্য দপ্তরের দিদিরা আসেন ডেঙ্গু জ্বরের খবর নিতে। কিন্তু আবর্জনা ও নর্দমা থেকে মশার বংশবিস্তার রোধে কোনো উদ্যোগ নেই। ৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলার অরুণ দাশগুপ্ত বলেন, পুরসভা থেকে বাড়ি বাড়ি আবর্জনা সংগ্রহের জন্য প্রায় প্রতিদিনই গাড়ি আসে। কিন্তু শহরের ২৫টি ওয়ার্ডের নিরিখে সেই গাড়ির সংখ্যা যথেষ্টই সীমিত। তাই প্রতিটি ওয়ার্ডে গাড়ি যাওয়ার ব্যবস্থা মাঝেমধ্যেই আবর্তিত হয়। কখনো একটি ওয়ার্ডে একদিনে দুটি গাড়ি চলে যাচ্ছে, আবার কোনোদিন একটি গাড়িও যাচ্ছে না। এই ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া উচিত।

১৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, বিশ্বাসপাড়া মোড় থেকে যুব সংঘ যাওয়ার রাস্তার ধারে বিভিন্ন জায়গায় আবর্জনা জমছে। বিশেষ করে রেনেসাঁ ক্লাবের উলটো দিকের একটি ফাঁকা জায়গার সামনে আবর্জনা জমতে জমতে প্রায় পাহাড় হয়ে গিয়েছে। গৃহবধূ দীপ্তিরাণি পাল জানান, য়ে রাস্তা দিয়ে আমরা বাড়ি ফিরি সেই রাস্তার মুখেই জমে থাকে আবর্জনা। ফলে বাড়িতে আমাদের থাকতে যেমন অসুবিধে হয়, তেমনই বাইরে থেকে কেউ এলেও আমরা প্রচণ্ড সমস্যায় পড়ি। এছাড়া আবর্জনার স্তূপের উপরে কুকুর উঠে সমস্ত নোংরা রাস্তায় ছড়িয়েছিটিয়ে দেয়। সবমিলিয়ে এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে চারপাশে। পুরসভার তরফে শহরের বেশ কিছু জায়গায় ডাস্টবিনও রাখা হয়েছে। অথচ এখানে একটি ডাস্টবিন রাখার ব্যবস্থা করলেই এই নরকযন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়া যায় বলে মত দীপ্তিদেবী।

প্রাক্তন ওয়ার্ড কাউন্সিলার শাশ্বতী মান্না জানান, প্রতিদিনই ওয়ার্ডে আবর্জনা তোলার গাড়ি আসে। নাগরিকদের উচিত সেই গাড়িতেই আবর্জনা ফেলা। কিন্তু অনেকেই তা না করে রাস্তার ধারে বাড়ির উচ্ছিষ্ট ফেলেন এবং তার শিকার হন নিজেরাই। পুজোর কয়েকটা দিন পুরব্যবস্থা একটু অনিয়মিত থাকলেও এখন অবস্থা অনেকটাই স্থিতিশীল। তবে, বাসিন্দাদের কোনো অভিযোগ থাকলে তাঁরা আমায় তা জানালে আমি পুরসভায় জানাতে পারি। কিন্তু বাসিন্দারা কোনো লিখিত অভিযোগ না করায় আবর্জনা নিয়ে ভোগান্তি বাড়ছে বিশ্বাসপাড়ার বাসিন্দাদের।

এই ব্যাপারে বালুরঘাট পুরসভার কার্যনির্বাহী আধিকারিক অতনু মণ্ডল বলেন, অসচেতন নাগরিকদের জন্যই এই দুরবস্থা। আমরা পুরপরিসেবা দেওয়ার পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে প্রচার চালাচ্ছি। কয়েকদিন আগেই পুরসভার পক্ষে নাট্যতীর্থ প্রেক্ষাগৃহে বালুরঘাটবাসীর মধ্যে একসপ্তাহব্যাপী সচেতনতা কর্মশালা চালিয়েছি। সেখানে সঠিক স্থানে আবর্জনা ফেলা সহ থার্মোকল, প্লাস্টিকজাত দ্রব্য ত্যাগ ইত্যাদির প্রচারও চালানো হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এমন খবর আসছে আমাদের কাছে, যা অন্ত্যন্ত হতাশাজনক।