রায়গঞ্জে ১০০ বিঘার জলাভূমি ভরাট করছে মাফিয়ারা

176

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ : রায়গঞ্জ শহরের বুকে প্রায় ১০০ বিঘার বিশাল জলাভূমি দিনের আলোয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন বন্ধ থাকার পর ফের জলা ভরাটের কাজ শুরু করে ফেলেছে মাফিয়ারা। জলাভূমি ভরাট রুখতে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। কিন্তু সেই নির্দেশকে উপেক্ষা করে রায়গঞ্জে একের পর এক জলাভূমি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ, বেআইনি এই কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বেশকিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাদের ভয়ে মুখ খুলতে চান না সাধারণ মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে রায়গঞ্জ শহরের অশোকপল্লি, শিল্পীনগর, নেতাজিপল্লি, এফসিআই মোড়, পূর্ব উকিলপাড়া এলাকায় জলাশয় ভরাট হয়ে চলেছে। রায়গঞ্জের অশোকপল্লি এলাকায় বেসরকারি একটি হোটেলের পাশে প্রায় ১০০ বিঘার একটি নয়ানজুলি রয়েছে। সেই জলাভূমিটিও মঙ্গলবার থেকে ভরাটের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ। টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে মাটি কাটার যন্ত্র দিয়ে ওই জলাশয়টি ভরাট করার অভিযোগ উঠেছে কিছু প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। ভূমি সংস্কার দপ্তরের তরফে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। জলাভূমি ভরাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে রায়গঞ্জ পুরসভাও। রায়গঞ্জ পুরসভার উপপুরপ্রধান অরিন্দম সরকার বলেন, বেআইনিভাবে জলাভূমি ভরাটের ক্ষেত্রে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করবে রায়গঞ্জ পুরসভা।

পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ রায়গঞ্জ শহরের বাসিন্দা থেকে শুরু করে পরিবেশবিদ ও নাগরিক কমিটি। তাঁদের অভিযোগ, একের পর এক জলা ভরাট হলেও জেলা প্রশাসন নির্বিকার। অধিকাংশ ভরাটের ক্ষেত্রে জড়িত রয়েছেন ঠিকাদার ও প্রভাবশালীরা। উত্তর দিনাজপুর জেলার নাগরিক কমিটির সম্পাদক তপন চৌধুরী বলেন, শিলিগুড়ি মোড় থেকে কসবা মোড় পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার জাতীয় সড়কের রাস্তার দুই পাশের জলাশয় ভরাট চলছে। আগে এই সব জলাশয়ে পানিফল চাষ করতেন কৃষকরা। প্রভাবশালীদের বন্দুকের সামনে মুখ খুলতে চান না স্থানীয় বাসিন্দারা। আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কীভাবে একের পর এক জলাশয়, দিঘি, পুকুর ভরাট হয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রশাসন মাফিয়াদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্রমশ জলাশয় হ্রাস হচ্ছে রায়গঞ্জ শহরে। এই  পরিস্থিতিতে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছে নাগরিক কমিটি।

- Advertisement -

রায়গঞ্জ পুর এলাকার উকিলপাড়ার পিরপুকুরের বিশাল জলাশয় টিনের বেড়া লাগিয়ে গোপনে ট্রাক বোঝাই মাটি ফেলা হচ্ছে। একাধিক পুকুর দ্রুত বুজিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পুরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক লাগোয়া বিরাট জলাশয় ভরাট চলছে। বছরখানেক আগেও ওই সড়কের দুই ধারে পানিফল চাষ হত। এখন ধুধু মাঠে পরিণত হয়েছে। অশোকপল্লির প্রায় কুড়ি বিঘার জলাশয় বুজিয়ে দেওয়ার কাজ চলছে। ওই পুরসভার তিন মৌজার মধ্যে মোহনবাটি মৌজায় পুকুরের সংখ্যা ছিল ১৮৪টি, ডোবার সংখ্যা ৫৪। বরুয়া মৌজায় পুকুর ছিল ১১২টি এবং ডোবা ৪৭টি। এছাড়া রায়গঞ্জ মৌজায় পুকুর এবং ডোবা মিলিয়ে অন্তত ৯৬টি জলাশয় ছিল। মাস কয়ে আগেও এগুলির অস্তিত্ব ছিল। রায়গঞ্জ ব্লকের ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর  সূত্রে জানা গিয়েছে, কোনওরকম জলাভূমি ভরাট করা বেআইনি। পরিবেশ বাঁচাতে বেআইনি ভরাট রুখতে হবে। মারনাই হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক তথা পরিবেশবিদ সঞ্জিত গোস্বামী বলেন, একের পর এক জলা ভরাটের ফলে বাস্তুতন্ত্রের বিঘ্ন ঘটবে। পরিবেশে তার প্রভাব পড়বে। শহরের বাসিন্দাদের উচিত বেআইনি জলা ভরাটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।

রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোলের অধ্যাপক তথা রায়গঞ্জ শহরের বাসিন্দা ডঃ তাপস পাল বলেন, শহরের একাংশ ওয়ার্ডের জল এই সমস্ত জলাশয়ে এসে পড়ত। একের পর এক জলাশয়, পুকুর, খাল, বিল বুঁজিয়ে ফেলার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই রায়গঞ্জ শহর জলমগ্ন হয়ে পড়বে। এই মুহূর্তে প্রতিবাদ না করলে এই জলাশয় ভরাটের জন্য শহরের মানুষকে প্রবল সমস্যার মুখে পড়তে হবে। কাঁদাবে ভবিষ্যৎকে।