ভাস্কর বাগচী, শিলিগুড়ি : ১৯৯৪ সালে ফুলবাড়িতে পানীয় জলের প্রকল্পের উদ্বোধনের পর তৎকালীন মেয়র প্রয়াত বিকাশ ঘোষ পুরনিগমের কাউন্সিলারদের জানিয়েছিলেন, যাঁর ওয়ার্ডে বেশি সংখ্যায় সাধারণ মানুষ বাড়িতে পানীয় জলের সংযোগ নেবেন সেই কাউন্সিলারকে পুরস্কৃত করা হবে। তাঁর ওয়ার্ডে উন্নয়নে বরাদ্দও বেশি দেওয়া হবে। সেই সময় বাড়িতে পানীয় জলের সংযোগ নেওয়ার ব্যাপারে সাধারণ মানুষ সেভাবে আগ্রহ দেখচ্ছিলেন না বলেই মেয়র এই ঘোষণা করেন। তার প্রায় আড়াই দশক পরে ২০১৯ সালে শিলিগুড়ি পুরনিগমে যেদিন বাড়িতে জলের সংযোগের জন্য কোনো দিন আবেদনপত্র জমা না পড়লে, সেদিন যেন কিছু স্বস্তিতে কাটান পুরনিগমের জলসরবরাহ বিভাগের কর্মী-অফিসাররা। একবার পুরনিগমে আবেদনপত্র জমা পড়ার মানে, সেই আবেদনকারীকে তাঁরা জল দিতে বাধ্য। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই পুরনিগমের।

শিলিগুড়ি পুরনিগমের ৩০টি ওয়ার্ডের জন্য ফুলবাড়িতে তৈরি হওয়া পানীয় জলের ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকে এখন জল যায় ৪৭টি ওয়ার্ডে। সেই জল সরবরাহের এমনই হাল যে অধিকাংশ ওয়ার্ডে মানুষ জল না পেয়ে ফাঁকা বালতি নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন প্রতিদিন। নিয়মিত জল না পেয়ে অনেকে আবার বাজার থেকে জল কিনে খাচ্ছেন। যাঁদের বাড়িতে কুয়ো নেই, তাঁরা সমস্যায় পড়ছেন সবচেয়ে বেশি। কারণ তাঁদের প্রতিদিনই খাওয়া থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সারার একমাত্র ভরসা পুরনিগমের সরবরাহ করা জল। তা প্রতিদিন প্রতি বেলায় দুঘণ্টা করে দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে মিলছে ১৫-২০ মিনিট করে। ন্যূনতম চাহিদাটুকুও না মেটায় প্রতিদিন শহরজুড়ে জলের জন্য হাহাকার করছেন অসংখ্য মানুষ। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, যতদিন পর্যন্ত না শিলিগুড়িতে দ্বিতীয় পানীয় জলপ্রকল্প তৈরি হচ্ছে ততদিন এই জল সমস্যা মিটবে না। কিন্তু সেটা কবে তৈরি হবে তা কেউ জানেন না। তৃণমূল সরকারের প্রথম দিকে শিলিগুড়িতে পানীয় জলের দ্বিতীয় প্রকল্প তৈরির পরিকল্পনা হয়েছিল। কিন্তু এই সরকারের প্রায় আট বছর কেটে গেলেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা শুরুই হয়নি। আবার বামেদের আমলে বর্তমান প্রকল্পটি তৈরি হওয়ার পর তারাও দ্বিতীয় প্রকল্পের জন্য উদ্যোগী হয়নি।

- Advertisement -

নয়ের দশকের শুরুতে যখন শিলিগুড়িতে পানীয় জল সরবরাহের জন্য ফুলবাড়িতে জলপ্রকল্প তৈরি হয়েছিল সেই সময় শিলিগুড়িতে ছিল মাত্র ৩০টি ওয়ার্ড। লোকসংখ্যা ছিল মেরেকেটে লাখ পাঁচেক। সেই সময় ওই ৩০টি ওয়ার্ডের জন্য যে জল পাওয়া যেত তা দিয়ে মানুষের চাহিদাপূরণ হয়ে যেত সহজেই। কিন্তু দিনে দিনে শহরের জনসংখ্যা বেড়েছে। ৩০টি ওয়ার্ড বেড়ে হয়েছে ৪৭টি। নয়ে দশকে যত জনসংখ্যা ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় সাত লক্ষ। এই সাত লক্ষ মানুষের প্রয়োজন মেটাতে দৈনিক শহরে প্রয়োজন ৭২ মিলিয়ন লিটার পানীয় জল। কিন্তু প্রতিদিন ফুলবাড়ির ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকে মেলে ৫৫ মিলিয়ন লিটার জল। সেই জল দিয়ে প্রথম দিকে ২৫ হাজার বাড়িতে পানীয় জলসংযোগ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা এখন ৩৮ হাজার হওয়ায় জলের সংকট তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি ওই ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকেই পুর এলাকার ১৮০০ স্ট্যান্ড পোস্টে জল সরবরাহ করা হয়।

শিলিগুড়ি পুরনিগমের জল সরবরাহ বিভাগের মেয়র পারিষদ শরদিন্দু চক্রবর্তী বলেন, দ্বিতীয় জলপ্রকল্প তৈরি না হলে শহরের মানুষের জল সমস্যা মেটার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তবে এর মধ্যেও আমরা বিভিন্ন ওয়ার্ডে ডিপ টিউবয়েল বসানো শুরু করেছি যাতে মানুষের কিছুটা সুরাহা হয়।