পাহাড় চোয়ানো জলই ভরসা রংটং-শিবখোলায়

75

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিবখোলা : বাঁশকে অর্ধেক করে কেটে তা গেঁথে দেওয়া হয়েছে পাহাড়ের গায়ে আর মাটি চুইয়ে জল এসে ওই বাঁশের মধ্যে দিয়ে জমা হচ্ছে নীচে রাখা কলসি বা প্লাস্টিকের ড্রামে। বাঁশের বদলে কেউ আবার প্লাস্টিকের পাইপ লাগিয়ে একই পদ্ধতিতে জল সংগ্রহ করছেন। শিলিগুড়ি শহর থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে রংটং, শিবখোলা সহ বেশ কয়েকটি গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ বেঁচে আছেন পাহাড়ের মাটি চুইয়ে আসা ওই জল খেয়ে পাহাড়ের উন্নয়ন নিয়ে প্রশাসনের তরফে নানা প্রকল্পের কথা বলা হলেও কাজের কাজ যে কিছু হয়নি, তা এই গ্রামগুলির জলকষ্ট যেন প্রমাণ করে দিচ্ছে।

পাহাড়ের যে অংশে মাটি চুইয়ে জল পড়ে, সেখানে সকাল থেকেই কলসি, ড্রামের লম্বা লাইন পড়ে যায়। ক্ষীণধারায় জল পড়ায় প্রতিদিন সবার ভাগ্যে জল জোটে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর অনেককেই ফিরতে হয় খালি ড্রাম নিয়ে যাঁরা জল পান, তাঁরা বাড়িতে নিয়ে কয়েক ঘণ্টা পাত্রেই রেখে দেন। জলে মিশে থাকা বালি থিতিয়ে গেলে, ওপর থেকে পরিষ্কার জল অন্য পাত্রে ঢেলে পান করা হয়। কয়েকদিন পর বর্ষা আসবে। এখন থেকে পাহাড়ে বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে। তাই আপাতত পাহাড়ের মাটিতে জলের জোগান থাকলেও শীতকালে পরিস্থিতি ভযংকর হয়ে ওঠে। মাটি শুকিয়ে যাওয়ায় জল কার্যত পাওয়া যায় না। একটুখানি জলের জন্য হাহাকার পড়ে যায় গ্রামগুলিতে।

- Advertisement -

যাঁদের উপার্জন বেশি, তাঁরা শহর থেকে জল কিনে এনে খান। কিন্তু একুশ শতকে এসেও পরিস্রুত পানীয় জল পান করার সুযোগ মেলেনি রংটংয়ের সুমন সুব্বা বা শিবখোলার মুকেশ গুরুংদের। চা বাগানের শ্রমিক মুকেশের খেদ, ভোট এলেই কেউ বলেন, পাহাড় হাসছে। কেউ বলেন, সোনার বাংলা গড়ব। আসলে আমাদের খবর কেউ রাখে না। অনেক কারসাজি করার পর এক কলসি জল ভরতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগছে। জলের কথা তুলতেই রেগে লাল হয়ে যান সুমন। বলেন, সব কাজ ফেলে বাড়ির একজনকে সারাদিন শুধু জলের খোঁজেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। জল জোগাড় করা আমাদের কাছে যুদ্ধের মতো হয়ে গিয়েছে।

বছরের পর বছর ধরে পাহাড়ের মাটি চুইয়ে আসা জল খেলেও স্থানীয়দের এখনও পর্যন্ত কোনও রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর নেই। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, যে পদ্ধতিতে পাহাড়ের বাসিন্দারা জল খাচ্ছেন, তাতে ক্রমশ নানা কঠিন রোগ বাসা বাঁধতে পারে। রংটং, শিবখোলা এলাকায় বেশ কয়েকটি চা বাগান আছে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে, ওই বাগানগুলিতে ব্যবহৃত কীটনাশক ও রাসায়নিক দিনের পর দিন মাটিতে মিশছে। পাহাড়ের খাত বেয়ে নেমে আসা জলের সঙ্গে ওইসব কীটনাশক ও রাসায়নিক মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট।

চিকিৎসক উজ্জ্বল আচার্য বলেন, দীর্ঘদিন অপরিস্রুত জল খেলে সেই জলের সঙ্গে নানা ধরনের ক্ষতিকর পদার্থ শরীরে ঢুকে যায়। যার ফলে লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পেটের নানা ধরনের রোগ হতে পারে।

দার্জিলিং পাহাড়ের জলসংকট মেটাতে দার্জিলিং, কালিম্পং ও কার্সিয়াং শহরের জন্য তিনটি পৃথক প্রকল্প তৈরি করেছিল জিটিএ। মিরিক, তিনধারিয়া, সিটং এবং রংবুলের জন্যও আলাদা চারটি প্রকল্প তৈরির কথা জানিয়েছিলেন জিটিএ কর্তারা। প্রকল্পগুলিতে নদীর জল পাইপলাইনের মাধ্যমে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে এনে পরিস্রুত করে বাড়ি, হোটেলে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে কোনও প্রকল্পই এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। পাহাড়ের শহরগুলিতে পানীয় জলের জন্য স্থানীয়ভাবে একাধিক পদক্ষেপ করা হলেও গ্রামগুলিতে নজর নেই কারও। কেন জলসমস্যা মেটানো যাচ্ছে না, তা নিয়ে জিটিএর কোনও আধিকারিক মন্তব্য করতে চাননি। জিটিএর প্রাক্তন চেয়ারম্যান অনীত থাপার বক্তব্য, আমরা উদ্যোগী হয়েছিলাম। প্রকল্প তৈরি করে রাজ্য সরকারের কাছে পাঠানোও হয়েছিল। কার্সিয়াংয়ের বিধায়ক বিপি বজগাইনের বক্তব্য, পাহাড়ের উন্নতিতে জিটিএ-তে কয়েকশো কোটি টাকা এসেছে। সেই টাকা দিয়ে কী কাজ হয়েছে, সেটাই রহস্যময়। বিধানসভায় এইসব সমস্যার কথা তুলব। রাজ্যের কাছে সমস্যা মেটানোর দাবি জানাব।