দক্ষিণ দিনাজপুরে কৃষিজমি গিলছে আত্রেয়ী, পুনর্ভবা

সুবীর মহন্ত বিপ্লব হালদার, বালুরঘাট তপন : উত্তরবঙ্গজুড়ে ব্যাপক বৃষ্টিপাতের ফলে জল বেড়ে দক্ষিণ দিনাজপুরের নদীগুলি ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে। আত্রেয়ী, যমুনা, পুনর্ভবা, টাঙন নদীতে জল বেড়েই চলেছে। প্রবল বৃষ্টিতে কোথাও ডুবেছে কৃষিজমি, কোথাও বাড়ি। বালুরঘাটের গ্রামাঞ্চলে আত্রেয়ী নদীর জল ঢুকে বাঁধাকপি ও ফুলকপি সহ শীতকালীন বিভিন্ন ফসল এখন জলের তলায়। আত্রেয়ী নদীতে জল বেড়ে যাওয়ায় জলমগ্ন হয়েছে প্রায় ২০০ হেক্টর কৃষিজমি। মাথায় হাত পড়েছে কৃষকদের। বালুরঘাট ব্লকের বোয়ালদার গ্রাম পঞ্চায়েতের বহু জায়গায় জল ঢুকে পড়েছে।

অন্যদিকে পুর্নভবা নদীর জলও বিপদসীমার উপর দিয়ে বইতে শুরু করায় তপন ব্লকের বেশ কিছু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। জলে ডুবে গিয়েছে ধান ও শাকসবজি সহ বহু ফসলের জমি। দেখা দিয়েছে নদী ভাঙনের আশঙ্কাও। তপনের ঘাটিকা, বাসকবাড়ি, নবাবনগর, শালগাঁ, লক্ষ্মীনারায়ণপুর, পদ, মান্দাপাড়া, লক্ষ্মীপুর, খাটিয়াপাড়া, শুকদেবপুর, বজরাপুকুর, আজমাতপুর এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। বালুরঘাট ব্লক কৃষি আধিকারিক পার্থ মুখোপাধ্যায় বলেন, নদীতীরবর্তী তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েত মিলিয়ে প্রায় ২০০ হেক্টর কৃষিজমিতে চাষ হয়। আত্রেয়ীর জল বেড়ে যাওয়ায় অনেক জমিতে জল ঢুকে পড়েছে। এর ফলে ২০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি কী হয় আমরা সেদিকে নজর রাখছি। পাশাপাশি তপনের বিডিও মাসুদ করিম শেখ বলেন, পুনর্ভবা নদীর জল বাড়ায় বেশ কিছু এলাকায় জল ঢুকতে শুরু করেছে। বেশ কিছু এলাকায় ফসলের জমিও ডুবেছে। বালির বস্তা মজুত রাখা হয়েছে। যেসব এলাকায় জল ঢুকছে সেই এলাকাগুলি নজরে রাখা হয়েছে।

- Advertisement -

এই মরশুমে শীতকালীন সবজি চাষ শুরু হয়। সেজন্য বাঁধাকপি, ফুলকপি, করলা, পটল সহ বিভিন্ন ধরনের ফসলের চাষ শুরু হয়েছে। শনিবার রাত থেকে হঠাৎ করে নদীর জল জমিতে ঢুকে পড়ায় কৃষকদের মাথায় হাত পড়েছে। বোয়ালদারের বেগুনবাড়ি, রাজাপুর সহ বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমি এখন জলের তলায়। বালুরঘাট ব্লকের বোয়ালদার গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা মুকুটরাম মাললার ধানিজমি ডুবে গিয়েছে। সবজি লাগিয়েছিলেন হরিলাল চৌধুরী, জগদীশ মাললারা। তাঁদের বেগুন, লাউ, কপি ইত্যাদি ফসলের জমিও ডুবে গিয়েছে। বোয়ালদার গ্রাম পঞ্চায়েতের মদনগঞ্জ ঘাটপাড়া এলাকার চাষি হরিলাল চৌধুরী বলেন, প্রায় ৫০০ একর জমি এখন জলের তলায়। ফুলকপি, বাঁধাকপি, পটল সহ নানারকম সবজির চারা লাগিয়েছিলাম। এখন সব নষ্ট হওয়ার মুখে। সবজিগুলি নষ্ট হয়ে গেলে প্রায় এক লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

এদিন তপনের পদপাড়া এলাকার বাসিন্দারা তড়িঘড়ি বাঁধ মোরামতির কাজে হাত লাগান। জলমগ্ন হওয়ার খবর পেয়ে এলাকাগুলি পরিদর্শনে যান তপন পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি রাজু দাস। নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা সিরাজ সরকার বলেন, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির ফলে নদীর জল এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে গিয়েছে। আমাদের চাষের জমি জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। এতে প্রচুর ক্ষতি হবে। তপনের আজমাতপুরের বাসিন্দা ক্ষিতিশ মণ্ডল বলেন, এর আগে জমি তলিয়ে যাওয়ায় পাটের ক্ষতি হয়েছে। জমি থেকে জল কমায় আমন ধান লাগিয়েছিলাম। কিন্তু ভরা আশ্বিনে যখন ধানের শিষ বের হচ্ছে সেই সময় জমিতে জল ঢুকে যাওয়ায় প্রচুর আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হল। পদপাড়ার বাসিন্দা সুশীল সরকার বলেন, গতকাল থেকে আমাদের এলাকায় জল উঠতে শুরু করায় ভীষণ চিন্তায় পড়েছি। স্থানীয় বাসিন্দা বিপুল মণ্ডল বলেন, নদীর ধারে আমাদের বসবাস। পুনর্ভবা নদীর জল ভরে ওঠায় নদী ভাঙনের আশঙ্কায় আমাদের রাতের ঘুম উড়েছে।

ইতিমধ্যেই গঙ্গারামপুরেও পুনর্ভবা বিপদসীমা ছাড়িয়েছে। টাঙন ও আত্রেয়ীর জলও বিপদসীমা ছুঁইছুঁই। সেচ দপ্তরের তথ্য অনুয়াযী, আত্রেয়ীর প্রাক বিপদসীমা ২২.৫৫ মিটার। অথচ আত্রেয়ীর জল বইছে ২২.৯৪ মিটার উচ্চতা দিয়ে। টাঙনের প্রাক বিপদসীমা ২৫.০০ মিটার। টাঙনের জল বইছে ২৫.৫৬ মিটার উপর দিয়ে। পুনর্ভবার বিপদসীমা ২৫.৮২ মিটারকে ছাড়িয়ে নদী বইছে ২৬.২৫ মিটার উপর দিয়ে। তপন পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি রাজু দাস বলেন, পুনর্ভবা নদীর জল বিপদসীমার উপর দিয়ে বইতে শুরু করায় নদীভাঙনের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। এখনও পর্যন্ত নদীর বাঁধ ভাঙার খবর নেই। তবে ইতিমধ্যে তপনের বেশ কিছু এলাকা জলমগ্ন হয়েছে। সেগুলি আমরা পরিদর্শন করে দেখছি।