রায়গঞ্জে লোপাট হচ্ছে জলাশয়, দেখা নেই পরিযায়ী পাখির

168

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ : একটা সময় ছিল, যখন রায়গঞ্জ শহরের যত্রতত্র বহু জলাশয় ছিল। প্রতিবছর সেই জলাশয়গুলিতে দেশ-বিদেশ থেকে পরিযায়ী পাখির দল ভিড় জমাত। কিন্তু গত কয়েক বছরে জমি মাফিয়াদের দাপটে রায়গঞ্জ শহরের জলাশয়গুলি লোপাট হয়েছে। জলাশয়ের অভাবে রায়গঞ্জ শহরে এখন আর পরিযায়ী পাখিদের দেখা মেলে না। পাখিপ্রেমীদের অভিযোগ, এই ঘটনায় নষ্ট হতে বসেছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে পরিবেশপ্রেমী গৌতম তান্ত্রিয়া বলেন, একেবারেই বেআইনিভাবে রায়গঞ্জ শহরের জলাশয় বন্ধ করা হচ্ছে। কোনওভাবেই জলাভূমির চরিত্র বদল করার আইন নেই। অথচ হচ্ছে। কেন হচ্ছে এর জবাবদিহি করতে হবে প্রশাসনকে। আমরা এর আগেও একবার প্রশাসনকে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলাম, আবার জানাব।

একই সঙ্গে মাটি ও আবর্জনা ফেলে পুকুর, জলাশয় ভরাট করে জমি বিক্রির অভিযোগও উঠেছে রায়গঞ্জ শহরে। শহরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের উদাসীনতায় এই ঘটনা ঘটে চলেছে। জলাশয় না থাকার কারণে শুধু প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে তাই নয়, যে কারণে এখন শহরের অগ্নিকাণ্ডে দমকল কর্মীদের জলের জন্য ঘুরে বেড়াতে হয়। যদিও প্রভাবশালীদের বক্তব্য, প্রশাসনের কিছু করার নেই। জলাশয়গুলি থেকে দূষণ ছড়াচ্ছে। সেগুলি বুজে ফেলাই ভালো। আরও অভিযোগ উঠেছে, পুকুর বুজিয়ে রায়গঞ্জ শহরে দেদার গড়ে উঠেছে আবাসন। জমির চরিত্র বদল করে চলছে প্রভাবশালীরাজ। এই ঘটনায় সরকারি ভূমি দপ্তরের আধিকারিকদের একাংশের সঙ্গে আঁতাত রয়েছে প্রভাবশালীদের। রায়গঞ্জ শহরের সর্বত্র প্রকাশ্যে একের পর এক পুকুর জলাভূমি ভরাট করে গড়ে উঠেছে বহুতল আবাসন। নষ্ট হচ্ছে বাস্তুতন্ত্র। যা কিছু হচ্ছে সব সকলের সামনেই। পুকুর জলাশয় বা জলাভূমি আইন অনুযায়ী কোনও কিছুই ভরাট করা যায় না। ভরাট করে ঘরবাড়ি আবাসন নির্মাণ আরও বড় অপরাধ। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, তারপরেও বছরের পর বছর ধরে কোন মন্ত্রবলে ভরাট হচ্ছে পুকুর!

- Advertisement -

গত কয়েক বছরে পুকুর ভরাটের সংখ্যা আরও বেড়ে গিয়েছে। পরিবেশপ্রেমীরা আন্দোলনে নামার হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু তার পরোয়া করে না অসাধু চক্র। উত্তর দিনাজপুর জেলার নাগরিক কমিটির সম্পাদক তপন চৌধুরী বলেন, একসময় শহরে প্রচুর জলাশয় ছিল। নগরায়নের ফলে অনেকটাই হারিয়েছে। প্রশাসন ও পুরসভাকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। জলাশয় হারিয়ে যাওয়ায় রায়গঞ্জ শহরে অগ্নিকাণ্ডে বিপাকে পড়তে হচ্ছে দমকলকেও। কিন্তু এরপরও প্রশাসনের কোনও হেলদোল নেই। প্রশাসনের উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে পুকুর ভরাট করে জমি বিক্রির কারবার চলছে। এটা বন্ধ হওয়া একান্ত জরুরি। রায়গঞ্জের বিধায়ক মোহিত সেনগুপ্ত বলেন, রায়গঞ্জ শহরের দেবীনগর কলেজপাড়া বিননগর বন্দর, উকিলপাড়া, শক্তিনগর, মিলনপাড়া, অশোকপল্লী সহ বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় পুকুর ছিল সেগুলি ভরাট করে ব্লকওয়াইজ জমি বিক্রি হয়েছে, কেউ আবার নার্সিংহোম প্যাথলজি সহ একাধিক ফ্ল্যাট তৈরি করেছে। পুকুর ভরাটের ব্যাপারে একাধিকবার জেলা শাসক সহ ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের আধিকারিকদের ডেপুটেশন দেওয়া হয়েছে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে আইনজীবী দিয়ে মামলাও করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রভাবশালীদের বক্তব্য, শহরের জনসংখ্যা বাড়ছে। এতে যদি দু-একটা জলাশয় বুঝে ফেলা হয় তাতে ক্ষতি কি! জমির মালিকদের বক্তব্য, আমার জমিতে জলাশয়। সেটা প্রয়োজন হলে ভরাট করতেই পারি। এতে প্রশাসনের কি করার আছে। জলাশয় পড়ে থাকায় মশা, মাছি বাড়ছে। তাই বুজিয়ে ফেলা হচ্ছে। একদিকে শহরে জমি বাড়বে অন্যদিকে মশা মাছির উপদ্রব কমবে। ফাঁকা জলাশয় পড়ে আছে। সেটা কোনও কাজে লাগে না। উলটে দূষণের কারণ হয়েছে। বন্ধ হলে ক্ষতি কি! যারা ভরাট করছেন তারা প্রত্যেকে প্রভাবশালী থেকে শুরু করে প্রোমোটার, ঠিকাদার, কেউ আবার এলাকার দাগি মস্তান, তাই সবকিছু মুখ বুজে থাকতে হয়। বিএলআরও প্রদীপ গিরি বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে। ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর আধিকারিক ও ডিএলআরও অতিরিক্ত জেলা শাসক বলেন, জলাশয় ভরাটের কিছু অভিযোগ পেয়েছি। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জলাভূমি ভরাট করতে দেওয়া হবে না। শীঘ্রই এর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।