পূর্ণেন্দু সরকার, জলপাইগুড়ি : জলাভূমি ভরাট নিয়ে জলপাইগুড়ি পুরভোটে এবার প্রচারে নামতে চলেছে রাজ্যের বিরোধী দলগুলি। জলপাইগুড়ি পুরসভার ২৫টি ওয়ার্ডে বেশ কয়েক জায়গায় জলাভূমি ভরাট করে নির্মাণকাজের জন্য জমি তৈরি করা হয়েছে। আবার বহু পুরোনো দিঘি বা জলাশয়ে দিনের পর দিন আবর্জনা ফেলে তা ভরাট করা হচ্ছে। জলপাইগুড়ি পুরসভা বিভিন্ন ওয়ার্ডে জলাভূমি সংরক্ষণে ব্যর্থ, এই অভিযোগ এনেই ভোট প্রচারে নেমেছে বিরোধীরা।

জলপাইগুড়ি পুরসভা উত্তরবঙ্গের মধ্যে অন্যতম পুরোনো পুরসভা। পুরনিগম না হলেও এই পুরসভায় জনসংখ্যা বেড়ে চলায় বাস্তুজমির চাহিদাও বেড়েছে। বিশেষত গত কয়ে বছরে জলপাইগুড়ি পুর এলাকায় বহুতলের সংখ্যা হুহু করে বেড়েছে। প্রাচীন জলাশয় থেকে ব্যক্তিগত মালিকানার জলাশয়গুলি বুজিয়ে বহুতল উঠছে বহু জায়গায়। জেলা সিপিএম সম্পাদক সলিল আচার্য বলেন, জলপাইগুড়ি শহরের লাইফলাইন করলা নদী। এই নদীতে জলধারণ ক্ষমতা কমেছে নাব্যতা কমে যাওয়ায়। পুর এলাকায় যেসব পুকুর, জলাশয়, দিঘি ছিল, তার মধ্যে অনেকগুলি আজ আর নেই। সেগুলি বুজিয়ে বিভিন্ন নির্মাণকাজ করা হয়েছে। বর্ষার সময় বৃষ্টির অতিরিক্ত জল এই জলাশয়গুলিতে চলে যেত। এখন তার অধিকাংশই বুজে যাওয়ায় শহরের নিকাশি ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ছে। আমরা পুরভোটে এলাকার জলাভূমি ভরাটের বিরোধিতা করে সেগুলি সংরক্ষণের দাবি তুলে প্রচার করছি।

- Advertisement -

বিজেপির জেলা সভাপতি বাপি গোস্বামী বলেন, বাম আমল থেকে শুরু করে কংগ্রেসের জমানায় বা বর্তমান তৃণমূলের সময়ে জলপাইগুড়ি পুর এলাকায় একাধিক জলাশয়, দিঘি ঠিকাদাররা বুজিয়ে ফেলে জমি তৈরি করে মোটা দামে বিক্রি করেছে। এখন তা অনেক বেশি করে চলছে। এই জিনিস চলতে দেওয়া যাবে না। জলাভূমি সংরক্ষণ আজকের দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা পুরবোর্ডে ক্ষমতায় এলে নির্দিষ্টভাবে পুর এলাকায় জলাভূমি সংরক্ষণ নীতি জারি করব। এবার পুরভোটে অবশ্যই এই সমস্যাকে আমরা প্রচারের ইশ্যু করতে চলেছি। জলপাইগুড়ি জেলা ফরওয়ার্ড ব্লকের সহসভাপতি গোবিন্দ রায় বলেন, দলের বাইরে নাগরিক মঞ্চ গড়ে আমরা পুর এলাকায় জলাভূমি সংরক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে লিখিতভাবে উদ্যোগ নিতে আবেদন জানিয়েছি। জলাভূমি ভরাট করে জমি বিক্রি চক্র শহর এলাকায় সক্রিয়। এর পিছনে প্রোমোটার রাজ রয়েছে রাজনৈতিক মদতেই। আমরা বামফ্রন্টের তরফে জলাভূমি ভরাটের বিষয়কে পুরভোটে প্রচারের হাতিয়ার করছি।

জেলা কংগ্রেস সভাপতি নির্মল ঘোষদস্তিদার বলেন, পুর এলাকায় যাঁদের ব্যক্তিগত জমি ছিল বা আছে তাঁদের অধিকাংশই জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরির জন্য। কিন্তু জমির অভাবে সুকৌশলে ধীরে ধীরে শহরের একাধিক জলাভূমি ভরাট করে নির্মাণকাজের জন্য জমি তৈরি করা হচ্ছে। এই বিষয়ে আমরা আগেও পুরসভাকে সতর্ক করেছি। কিন্তু সমস্যার সুরাহা হয়নি। আমরা ভোট প্রচারে এবার তা ইশ্যু করছি। জলপাইগুড়ি পুরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কংগ্রেস কাউন্সিলার নারায়ণ সরকার বলেন, আমার ওয়ার্ডে হাইস্কুলের সামনের জলাশয়টি দীর্ঘ বছর ধরে আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে। অনেক নিষেধ করেও নোংরা ফেলা বন্ধ করা যাচ্ছে না। শহরের অন্য জলাশয়গুলির মতো এই জলাশয়কেও সংস্কার করে সৌন্দর্যায়ন করার দাবি তুলেছি।

এই বিষয়ে শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বিজয়চন্দ্র বর্মন বলেন, পুর এলাকায় রাজবাড়িদিঘি সবচেয়ে বড়। এটির সঙ্গে কান্তেশ্বরীদিঘি, কালুসাহেবের মাজার সংলগ্ন দিঘির মতো কয়েকটিকে সাজিয়ে সংরক্ষণ করেছি। আরও কয়েটি সাজানোর প্রস্তাব রয়েছে। বিরোধীরা এই বিষয়কে ইশ্যু করলে তাদের এটাও বলতে হবে, তাদের আমলে তারা জলাভূমি সংরক্ষণে কী উদ্যোগ নিয়েছিল। জলপাইগুড়ির পুরপ্রধান মোহন বসু এই বিষয়ে বলেন, জলাভূমি ভরাটের অভিযোগ পেলে আমরা প্রযোজনীয় ব্যবস্থা আগেও নিয়েছি, এখনও অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেব। অনেক ওয়ার্ডে পুরসভা থেকেই জলাশয় সংরক্ষণ করা হয়েছে। পুরসভা থেকে বাড়ি বাড়ি আবর্জনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। কেউ যদি নদী বা পুকুরে আবর্জনা ফেলে সেক্ষেত্রে সচেতনতা দরকার। কোনও জলাশয় ভরাট করে নির্মাণকাজ চললে সেই বিষয়ে অভিযোগ পেলে আমাদের যা করণীয় করব। কিন্তু এই ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের দেখার বিষয়। কে কী প্রচার করবে জানি না, আমরা পুরবোর্ডে থেকে কী করেছি তার তথ্য ও ছবি দিয়ে প্রচার করব।