কিষান রেল পায়নি রাজ্য, সাংসদদের ভূমিকায় প্রশ্ন

উত্তরবঙ্গ ব্যুরো : নতুন কৃষি আইন আনার আগেই করোনা পরিস্থিতির মাঝেই গত ৭ অগাস্ট থেকে ভারতীয় রেল চালু করেছে কিষান রেল প্রকল্প। এই নতুন পরিষেবায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উৎপাদিত কৃষি ও ডেয়ারি পণ্য দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে মুম্বই, দিল্লি, বেঙ্গালুরুর মতো দেশের বড় মান্ডিগুলোয়। রেলমন্ত্রকের যুক্তি, এর ফলে কৃষক এবং ডেয়ারি উৎপাদকরা সরাসরি দেশের বড় মান্ডিগুলোয় তাঁদের পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। তাছাড়া রেলের মাধ্যমে পরিবহণ খরচ এবং সময় দুই-ই বাঁচবে। ইতিমধ্যে আম, কলা, পেঁয়াজ, সবেদা স্পেশাল কিষান রেল চালু হয়েছে। অগাস্ট মাস থেকে মহারাষ্ট্রের দেওলালি এবং কোলাপুরের পেঁয়াজ ও কলা বিহারের মুজফফরপুরে নিয়ে আসা হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে অন্ধ্রপ্রদেশের কৃষকরা কিষান ট্রেনে আম, টমেটো, কলা, বেদানা, তরমুজ নিয়ে দিল্লিতে গিয়ে বিক্রি করেছেন। সঠিক সময়ে ভালো বাজার পাওয়ায় কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন।

মজার বিষয় হল, কৃষিপ্রধান এই রাজ্য থেকে গত লোকসভা নির্বাচনে ১৮ জন বিজেপি সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর দুজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছেন। তা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত এ রাজ্যের কৃষকদের জন্য একটিও কিষান রেল চালু হয়নি। এনিয়ে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে সাধারণ কৃষক এবং কৃষিপণ্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গ তো দূরের কথা, গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য একটিও কিষান রেল বরাদ্দ হয়নি। রাজ্য থেকে কিষান রেল না চালু হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার এবং রেলমন্ত্রক হয়তো মনে করেছে এই রাজ্যে কৃষক নেই তাই দেয়নি। এই সরকারের কৃষকবিরোধী চরিত্র নতুন কৃষি আইনেই স্পষ্ট হয়েছে। এই রাজ্যের জন্য ওঁরা কিছু দেবেন, সেটা আমরা আশাও করি না। তবে রাজ্য সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের কৃষকদের সঙ্গে আছেন। এই বঞ্চনার জবাব রাজ্যের কৃষকরা ঐক্যবদ্ধভাবে দেবেন।

- Advertisement -

উত্তরবঙ্গের অন্যতম অর্থকরী ফসল আলু। ফালাকাটা ও ধূপগুড়ির বিস্তীর্ণ এলাকায় আলুর চাষ হয়। অসম-বিহার সহ বিভিন্ন রাজ্যে এই আলু চালান যায়। সড়কপথে পাঠানোর কারণে আলু অনেকটা পচে নষ্ট হয়। আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন ব্যবসায়ীরা। আলিপুরদুয়ার জেলার কৃষিবলয় ফালাকাটা ব্লক থেকে ভিনরাজ্যে আলু ও ভুট্টা চালান যায়। ব্লকের প্রায় ৬০০০ হেক্টর জমিতে আলু ও ৪৫০০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়। ফালাকাটার কিষান মান্ডিতে প্রতিদিন কয়েক হাজার ভিনরাজ্যের ব্যবসায়ী আসেন সবজি কিনতে। কোনও কারণে তাঁরা না এলে সেদিন কিষান মান্ডিতে আসা কৃষকরা তাঁদের ফসলের দাম পান না। তৃণমূল কংগ্রেসের কৃষক সংগঠনের জেলা সভাপতি প্রসেনজিৎ রায় বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনায় ফালাকাটা সহ গোটা উত্তরবঙ্গকে বঞ্চিত করা হয়েছে। জলপাইগুড়ি জেলায় প্রতিবছর প্রায় ৬৫০০ হেক্টর জমিতে পোখরাজ আলুর চাষ হয়।

কিষান রেল নিয়ে সরব জলপাইগুড়ি জেলার কৃষক সংগঠনের লোকেরাও। সারা ভারত কৃষকসভার জলপাইগুড়ি জেলা কমিটির সদস্য প্রাণগোপাল ভাওয়াল বলেন, মোদি আর দিদি লড়াইয়ে শিকার হচ্ছেন বাংলার মানুষ। উত্তরবঙ্গে আলু, আনারস, আম সহ অন্যান্য কৃষিপণ্য সারা দেশে পৌঁছে দিতে রাজ্য থেকে অন্তত তিনটি কিষান রেল চালুর দাবি করছি। এনিয়ে আন্দোলনেও নামব কৃষকদের স্বার্থে। ভালো ফলন হলে এটা ৩.৫ থেকে ৪ লক্ষ মেট্রিক টনে পৌঁছে যায়। জেলায় নথিভুক্ত আমচাষির সংখ্যা ৯০ হাজার। অথচ দিল্লি বা মুম্বইয়ে মান্ডিতে সেই আম পৌঁছে দেওয়ার মতো একটা কিষান স্পেশাল ট্রেন মালদার ভাগ্যে জোটেনি। মালদা উত্তর কেন্দ্রের বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু বলছেন, কেন্দ্রীয় প্রকল্প রূপায়ণে রাজ্য সরকারের প্রবল অনীহা রয়েছে। এখানে রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলোর নাম বদলে দেয়। তবে, বাংলার কৃষকদের স্বার্থে কিষান স্পেশাল ট্রেন পাওয়া উচিত। আমি দিল্লি গিয়ে রেলমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব।

দার্জিলিং জেলার বিধাননগর এবং পার্শ্ববর্তী উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়ার আনারসের দেশজুড়ে খ্যাতি রয়েছে। এখানে অতীতে ১৫-২৮ হাজার হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হত। কিন্তু ভালো দাম না পাওয়ায় প্রতি বছর প্রচুর আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন চাষিরা। এই পরিস্থিতিতে আনারস চাষের এলাকা কমতে কমতে ২০ হাজার হেক্টর জমিতে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর এই অঞ্চলে ছয় লক্ষ মেট্রিকটন আনারসের উৎপাদন হয়। আনারসচাষি সংগঠন সূত্রের খবর, এখানে উৎপাদিত আনারসের ৮০ শতাংশই দিল্লির বাজারের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে গত কয়েক বছর ধরে এখানকার আনারস বাইরে যাচ্ছে না বললেই চলে। পাশাপাশি যেটুকু আনারস দিল্লিতে যাচ্ছে, লরিতে অনেকদিন সময় লাগায় রাস্তাতেই ৩০-৪০ শতাংশ আনারস পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কিষান রেলের ব্যবস্থা হলে এখানকার আনারস খুব সহজেই দিল্লির বাজারে পাঠানো যেত।

আনারস চাষি সংগঠনের সম্পাদক অরুণ মণ্ডল বলেন, এখানকার আনারসের বাজার প্রায় পুরোটাই দিল্লির বাজারনির্ভর। দিল্লির আজাদপুর মার্কেটে আনারস পাঠাতে হয়। সড়কপথে আনারস পাঠানোয় ৩০ শতাংশের বেশি ফল নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হয় ব্যবসায়ীদের। কাজেই তাঁরাও চাষিদের সেভাবে ফসলের দাম দেন না। কিষান রেল পেলে ভালো হবে। আনারস ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি কাজল ঘোষ বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রের কাছে একটা দাবি তুলেছিলাম যে, পণ্যবাহী ট্রেনের একটি রেক রাঙ্গাপানিতে দেওয়া হোক। তাতে এখানকার আনারস রপ্তানি করা যাবে। যশবন্ত সিংহ দার্জিলিংয়ে সাংসদ থাকাকালীন তাঁর কাছেও এই দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে কাজ কিছুই হয়নি। কেন্দ্র কিষান রেল চালু করেছে এটা ভালো কথা, কিন্তু উত্তরবঙ্গ বা উত্তর-পূর্ব ভারতকে বঞ্চিত করা হচ্ছে কেন? শুধু ভোটের সময় ভোট নেবে আর মানুষের সুখদুঃখের কথা ভাববে না এটা হতে পারে না।

জলপাইগুড়ির বিজেপি সাংসদ ডাঃ জয়ন্ত রায় আশ্বাস দিয়েছেন দ্রুত এরাজ্য থেকে কিষান রেল চালুর বিষয়ে। তিনি বলেন, বিষয়টি ইতিমধ্যেই আমি সংসদে তুলেছি এবং সদ্যপ্রয়াত রেল রাষ্ট্রমন্ত্রী সুরেশ আঙ্গাদির সঙ্গেও আমার বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছিল। আমার সংসদীয় এলাকায় উৎপাদিত আলু, টমেটো, লংকার মতো কৃষিপণ্যের স্বার্থে কিষান রেল চালুর চেষ্টায় রয়েছি আমি। রেলমন্ত্রকের সদর্থক সাড়াও মিলেছে। নতুন কৃষি আইন যেমন কৃষকের জন্য নতুন দিগন্ত এবং বাজার খুলে দেবে তেমনই খুব তাড়াতাড়ি কিষান রেলের মাধ্যমে এই রাজ্যের কৃষকরাও সারা দেশে কৃষিপণ্য বিক্রির সুযোগ পাবেন। সম্প্রতি বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা উত্তরবঙ্গে সফরে এলে দার্জিলিংয়ে সাংসদ রাজু বিস্ট ও কোচবিহারের সাংসদ নিশীথ প্রামাণিক তাঁর কাছে কিষান রেলের দাবি জানান। বিজেপি সূত্রে খবর, নাড্ডা তাঁদের বিষয়টি নিয়ে রেলমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন। এদিন রাজু বিস্ট বলেন, রাজ্যকে এ ব্যাপারে প্রস্তাব দিতে হয়। কিন্তু রাজ্য থেকে কোনও প্রস্তাব রেলকে দেওয়া হয়নি। তবু আমরা উদ্যোগী হচ্ছি।