টিঙ্কোপানির জঙ্গলে জঙ্গিঘাঁটি চলছে অস্ত্র কেনাবেচা

65

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, তিনসুকিয়া : অসম-অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তে থাকা টিঙ্কোপানি সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিয়ে চিন্তা বাড়ছে গোয়েন্দাদের। তাঁদের আশঙ্কা টিঙ্কোপানির গভীর জঙ্গলে ডেরা বেঁধেছে উলফা, কেএলও, এনএসসিএন সহ একাধিক জঙ্গি সংগঠন। আর সেখান থেকেই নিয়মিত অস্ত্র ও বিস্ফোরক কেনাবেচা এবং হাতবদল হচ্ছে। বেশ কয়েকমাস ধরে টিঙ্কোপানি থেকে অস্ত্রের কারবার চলছে বলেই একপ্রকার নিশ্চিত সেনা গোয়েন্দারা।

চলতি বছর ১০ অগাস্ট রাতে টিঙ্কোপানির জঙ্গলে অভিযান চালিয়ে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অফ নাগাল্যান্ড (এনএসসিএন) গ্রুপের চার জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেন অসম রাইফেলসের জওয়ানরা। তাদের কাছ থেকে এক ডজনেরও বেশি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়। তখন থেকেই টিঙ্কোপানির উপর নজরদারি বাড়িয়েছিলেন সেনা গোয়েন্দারা। ১১ সেপ্টেম্বর গোপন সূত্রের খবরের ভিত্তিতে আসাম রাজ্য পুলিশ ও আসাম রাইফেলস টিঙ্কোপানির একটি অংশে যৌথ অভিযান চালায়। সূত্রের খবর, বেশ কয়েকজন জঙ্গি পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও অস্ত্র সহ উলফার এক মহিলা ক্যাডার ধরা পড়ে। তার মোবাইলের তথ্য ঘেঁটে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পরই টিঙ্কোপানি থেকে অস্ত্র কেনাবেচার বড়সড়ো কারবারের কথা জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা।

- Advertisement -

মায়ানমার থেকে অরুণাচলপ্রদেশ হয়ে জঙ্গলের রাস্তা ধরে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আনা হচ্ছে টিঙ্কোপানির গোপন ঘাঁটিতে। তারপর সেখান থেকে সেগুলি হাতবদলে চলে যাচ্ছে দেশবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের কাছে। মায়ানমার থেকে অস্ত্র জঙ্গলে আনা এবং হাতবদলের পর সেগুলি গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে লিংকম্যানরা। সেনাবাহিনীর ভাষায় যাদের বলা হয় ওভার গ্রাউন্ড ওয়ার্কার (ওজিডব্লিউ)।

সম্প্রতি আসাম রাইফেলসের গোয়েন্দারা জানতে পারেন, টিঙ্কোপানি থেকে অস্ত্র কেনার জন্য মণিপুরের ইম্ফলে একাধিক জঙ্গি সংগঠনের বেশ কয়েকজন ওজিডব্লিউ একত্রিত হয়েছে। সেইমতো অভিযান চালিয়ে ১২ সেপ্টেম্বর ইম্ফলের লাঙল এলাকা থেকে ন্যাশনাল রেভলিউশনারি ফ্রন্ট অফ মণিপুর (এনআরএফএম)-এর এক ওজিডব্লিউকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন আসাম রাইফেলেসের জওয়ানরা। ওই জঙ্গির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৩ সেপ্টেম্বর ইম্ফলের মালম অ্যাওয়াং লেইকাই গ্রাম থেকে এনআরএফএম-এর আরেক ওজিডব্লিউকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর ইম্ফলের তারুং থেকে আরও এক জঙ্গিকে পাকড়াও করে আসাম রাইফেলস।

ধৃতদের কাছ থেকে টিঙ্কোপানি অস্ত্র কারবার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বহু তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। সূত্রের খবর, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেই মায়ানমার থেকে ভারত হয়ে নেপালে অস্ত্র পাচারের কারবার সম্পর্কেও চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য এসেছে গোয়েন্দাদের হাতে। ১০ সেপ্টেম্বর ডিমাপুরের নাগাল্যান্ড গেটে প্রায় পাঁচ কিলোগ্রাম বিস্ফোরক এবং ৩৮টি নিওজেল-৯০ স্টিক সহ এক ওজিডব্লিউকে গ্রেপ্তার করেছিল আসাম রাইফেলস। বিপুল পরিমাণ সেই বিস্ফোরক উত্তরবঙ্গ এবং নেপালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলেই খবর। বিস্ফোরকগুলি কেএলও জঙ্গিদের ডেরায় পৌঁছে দেবার চেষ্টা হচ্ছিল বলেই আশঙ্কা করছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের একাংশ। নাশকতার জন্যই বিস্ফোরকগুলি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলে খবর। তবে কোথায় নাশকতার ছক কষা হয়েছিল সে সম্পর্কে এখনই কিছু বলতে চাইছেন না গোয়েন্দাকর্তারা।

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক আধিকারিক বলেন, নিরাপত্তা এজেন্সিগুলিকে ফাঁকি দিতে মাঝেমধ্যেই অস্ত্র কেনাবেচা বা বৈঠকের জায়গা বদলায় জঙ্গিরা। সেভাবেই টিঙ্কোপানিতে ওদের ঘাঁটি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট প্রবল। ভৌগোলিক দিক থেকে টিঙ্কোপানির অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্রের খবর, মায়ানমার থেকে অস্ত্র সরবরাহ করছে এনএসসিএন গোষ্ঠীর জঙ্গিরা। তারপর সেগুলি হাতবদলে চলে যাচ্ছে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের কাছে। তাই টিঙ্কোপানির জঙ্গলে বড়সড়ো অভিযান চালাতে পারে আসাম রাইফেলস। সবমিলিয়ে টিঙ্কোপানির অস্ত্র কারবারে উত্তরবঙ্গের নিরাপত্তা নিয়ে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন গোয়েন্দারা।