প্রথম দফার ভোট সামলাতে নাজেহাল কমিশন

141
প্রতীকী ছবি।

কলকাতা: প্রথম দফার ভোটেই নাকাল হতে হল নির্বাচন কমিশনকে। সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হতেই একের পর এক অভিযোগ ও পালটা অভিযোগ জমা পড়তে থাকে কমিশনের কাছে। অভিযোগের পাহাড় জমতে থাকায় কমিশনের অফিসারদের কথা বলার ফুরসত ছিল না। শনিবার প্রথম দফার ভোটে জঙ্গলমহল ও পূর্ব মেদিনীপুরের একাংশে ৩০টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়। সকাল থেকেই কোথাও প্রার্থীকে ধাক্কা দিয়ে বুথ থেকে বার করে দেওয়ার অভিযোগ, কোথাও ইভিএম খারাপ, ইভিএমে কারচুপি আবার কোথাও কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠতে শুরু করে। কাঁথিতে সৌমেন্দু অধিকারীর গাড়ি ভাঙচুর হয়। সন্ধ্যায় কমিশন জানায়, সৌমেন্দুর গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ছাতনায় দুটি এবং রানিবাঁধে একটি  বুথে ভোট বয়কটের ঘটনা ঘটেছে।

বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক দলের কর্মীরা পরস্পরের সঙ্গে কথা কাটাকাটিতে জড়ান সকাল থেকেই। বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, হাতাহাতি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। এরই মাঝে ভোট গ্রহণ প্রক্রিযাও চলতে থাকে নিজস্ব গতিতে। বাইরে যখন তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি তখনও জঙ্গলমহলে ভোটদানের হার ছিল স্বাভাবিক। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সেখানে গড়ে ৮১ শতাংশ ভোট পড়েছে। ঝাড়গ্রামে পড়ে ৮২ শতাংশ, বাঁকুড়ায় ৮০ শতাংশ, পূর্ব মেদিনীপুরে ৮১.৯ শতাংশ, পশ্চিম মেদিনীপুরে ৮০ শতাংশ এবং পুরুলিয়ায় ৮১ শতাংশ ভোট পড়ে।

- Advertisement -

এদিন সকালে ভোট গ্রহণ পর্বের তাল কাটে যখন পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়ারিতে এক বিজেপি কর্মীর মৃতদেহ উদ্ধার হয়। এই ঘটনায় সাময়িক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। কমিশন এই ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের কাছে রিপোর্ট তলব করে। জেলা প্রশাসন প্রাথমিকভাবে জানিয়ে দেয়, ওই বিজেপি কর্মীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর জেলা প্রশাসন এই নিয়ে কমিশনের কাছে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দেবে।

ভোট গ্রহণ শুরু হতেই তণমূলের পক্ষ থেকে একের পর এক অভিযোগ কমিশনে জানানো হয়। বেলা ১১টা পর্যন্ত শুধুমাত্র তৃণমূলের তরফেই ১৪৬টি অভিযোগ কমিশনে জমা হয়। পরপর ১৫টি বুথের তালিকা তুলে ধরে তৃণমূলের তরফে কমিশনের কাছে নালিশ জানানো হয়, ওই বুথগুলির সামনে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা ভোটারদের বিজেপিতে ভোট দেওয়ার জন্য প্রভাবিত করছে। কমিশন সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারদের কাছে রিপোর্ট তলব করে। এছাড়াও পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুর, খেজুরি, কাঁথি উত্তর, কাঁথি দক্ষিণ এবং এগরা কেন্দ্রে বিজেপি কর্মীরা কেন্দ্রীয় বাহিনীর সাহায্য নিয়ে বুথ থেকে তাদের এজেন্টকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ জানায় তৃণমূল কংগ্রেস।

এদিন সকালে শালবনির একটি বুথে ভোট দেখতে যান সেখানকার বাম প্রার্থী সুশান্ত ঘোষ। সেখানে তৃণমূল কর্মীরা তাঁকে ধাক্কা মেরে বের করে দেয় বলে অভিযোগ। সেখানে সুশান্তবাবুর দুই দেহরক্ষী ছাড়া আর কোনও পুলিশ ছিল না। নিরাপত্তারক্ষীরা সেখান থেকে সুশান্তবাবুকে সরিয়ে নিয়ে যান। খবর পেয়ে বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে যায়।

এদিন বেলা ১১টা নাগাদ দক্ষিণ কাঁথির সাবাজপুরের একটি বুথে যান শুভেন্দু অধিকারীর ভাই সৌমেন্দু। তিনি গাড়ি থেকে নেমে বুথের দিকে এগোতেই তৃণমূল কর্মীরা তাঁর গাড়িতে হামলা চালায় বলে অভিযোগ। তাঁর গাড়ির কাচ ভেঙে দেওয়া হয়। চালক জখম হন। এই নিয়ে বিজেপি কমিশনে অভিযোগ জানায়।

এদিন সকাল থেকে কমিশনের কর্তারা চূড়ান্ত ব্যস্ত ছিলেন। অভিযোগ ও পালটা অভিযোগে কার্যত নাজেহাল হয়ে যান প্রশাসনের কর্তারা। কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, বিকাল ৩টে পর্যন্ত কমিশনের কাছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৩২২টি অভিযোগ জমা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ জানিয়েছে তৃণমূল। তৃণমূলের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি ভিডিও রেকর্ডিংও কমিশনের কাছে তুলে দেওয়া হয়েছে, যেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা বিজেপির পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের প্রভাবিত করছেন বলে দেখানো হয়েছে।

এদিন গোপীবল্লভপুরের একটি বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনীর এক জওয়ানকে বলতে শোনা যায়, আমি কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী। সরকার যেভাবে বলবে, সেভাবেই ভোট করব। কেন্দ্রীয় বাহিনীর ওই জওয়ানের এই মন্তব্য নিয়ে তৃণমূল কমিশনে অভিযোগ জানিয়েছে। যদিও বিজেপির পালটা অভিযোগ, কিছু কিছু জায়গায় রাজ্য পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করে রেখে তৃণমূল বুথ দখলের চেষ্টা করেছে। এদিন পুরুলিয়া সদর বিধানসভা কেন্দ্রের মুনসেফডাঙার ১২৭ নম্বর বুথের একটি ভিডিও সামনে এসেছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, পুরুলিয়ার তৃণমূল প্রার্থী সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি কর্মীদের গুলি করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। বিজেপির পক্ষ থেকে ওই ভিডিও কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে।

এদিন সকাল থেকে দক্ষিণ কাঁথি বিধানসভার ১৭২ নম্বর বুথে প্রায় তিন ঘণ্টা ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকে। ভোটারদের অভিযোগ ছিল, এই বুথের ইভিএমে তৃণমূলকে ভোট দিলেও তা পড়ছে বিজেপিতে। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনা নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান। তৃণমূল কর্মীরা তুমুল বিক্ষোভ শুরু করেন। টায়ার জ্বালিয়ে তৃণমূল কর্মীরা বুথের সামনে বিক্ষোভ দেখান। খবর পেয়ে পর্যবেক্ষক ওই বুথে যান। তিনি ইভিএম পরীক্ষা করেন। এরপর তিনি কমিশনে রিপোর্ট দেন। কমিশন তৃণমূলের অভিযোগ খারিজ করে দেয়। অন্যদিকে, দাঁতন বিধানসভার মোহনপুর ব্লকের ৫ নম্বর তনুয়া কাশিদা গ্রামের ২৩৬ নম্বর বুথে এক বিজেপি কর্মীকে মেরে মুখ ফাটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে ওই বিজেপি কর্মীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এদিন বড় সংঘর্ষ এড়ানো গেলেও প্রথম দফার ভোটে কমিশনের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর হল না। এই দফার ভোট জানান দিয়ে গেল আগামী দিনের ভোট কমিশনের কাছে রীতিমতো অগ্নিপরীক্ষার শামিল হবে।