গণতন্ত্র আর কোথায়? এখন তো চলছে রাজতন্ত্র

131

মাধবী মুখোপাধ্যায়

আমার স্বামী নির্মলকুমার খাঁটি বামপন্থীমনস্ক মানুষ। সিপিএম ছাড়া অন্য কাউকে ভোট দেওয়ার কথা কস্মিনকালেও ভাবেননি। আমাকেও সেই সময় ভাবতে দেননি। ওই সময় লাইন দিয়ে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে আমার তেমন আগ্রহ ছিল না। স্বামীর সঙ্গে যেতে তখন খানিক বাধ্যই হতাম। আজ আমার সেই পরাধীনতা নেই। প্রায় বাইশ-তেইশ বছর আমি থাকি স্বামীর লেক গার্ডেন্সের বাড়ি থেকে কিছু দূরে, গোবিন্দপুরে নিজের ফ্ল্যাটে। আজ আমি কাকে ভোট দেব, তা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। আমায় জোর করার কেউ নেই।

- Advertisement -

এই যে বাংলায় ভোট চলে এল, তাতে স্মৃতিকাতর হওয়া উচিত আমার। আমি নিজেও তো বিধানসভা ভোটে দাঁড়িয়েছিলাম। তাই স্মৃতি সবসময় পিছুই হাঁটে। ভোট এলেই কত যে কথা, কত যে স্মৃতি অজান্তে জমা হয় মনের অন্তরে, তা মনই জানে! গণতন্ত্রের নিয়ম মেনে সেই ভোট আজ আবার সামনে। গণতান্ত্রিক নিয়ম মেনে ভোট দিতে গুটিগুটি বাড়ির সামনে, গোবিন্দপুরের ভোটকেন্দ্রেও যাব। কারণ নিজের ভোট নিজে দিন কথাটা তো আর আজ নয়, বিয়ের বাহান্ন বছর ধরে মুখে শুনে আসছি। নির্মলকুমার কথাগুলো খুব বলতেন।

তবে একটা সত্যি কথা বলছি। এবারও ভোট দেব ঠিকই, কিন্তু মন থেকে চারপাশের অনেক কিছু যেন কিছুতেই মানতে পারছি না। চারদিকের অনেক কথা ভাবাচ্ছে খুব।

প্রথম কথা, ভোটের আগে এই যে মহাপ্রলয় মারামারি-কাটাকাটি চারদিকে, তা আগে তেমন দেখিনি। আগে বাংলায় ভোট যেন কেমন একটা উৎসব-উৎসব ব্যাপার ছিল। সেটাই আজ নেই। কেন নেই? দ্বিতীয়ত, আজ দেখছি চারদিক যেন কেমন কলুষিত হয়ে গিয়েছে। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি চলছে। আজ গণতন্ত্র কোথায়! আজ তো রাজতন্ত্র শুরু হয়ে গিয়েছে। শুনছি, অনেক নেতাই বলছেন, মানুষের সেবা করতে রাজনীতিতে আসা। কিন্তু সাধারণের কথা কি সত্যিই তাঁরা ভাবছেন? কী জানি!

মনে পড়ে যাচ্ছে, এই সাধারণ মানুষের কথা ভাবতে গিয়ে একবার আমি তৃণমূলের প্রার্থী হয়ে যাদবপুর কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছিলাম। যদিও বলতে গেলে, দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলাম। কারণটা মনে আছে স্পষ্ট। তখন স্টার থিয়েটার পুড়ে গিয়েছিল। সেই থিয়েটার বাঁচানোর জন্য আমরা গিয়েছিলাম তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর কাছে। কিন্তু গিয়ে কোনও লাভ হয়নি। তাই আমরা অভিনেতা-অভিনেত্রীরা পরে গিয়েছিলাম তৎকালীন কলকাতার মেয়র সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের কাছে। তিনি বলেছিলেন, কাজ হয়ে যাবে। সঙ্গে একটা পালটা প্রস্তাব ছিল। আমাকে যাদবপুরের সিপিএম প্রার্থী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর বিরুদ্ধে তৃণমূলের প্রার্থী হয়ে দাঁড়াতে হবে।

তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ালেও বুদ্ধদেববাবুর প্রতি আমার আজও সমান শ্রদ্ধা রয়েছে। এখন অত মনে নেই, সেই ভোটে আমি সম্ভবত ২৯ হাজারেরও বেশি ভোটে হেরেছিলাম। কিন্তু বহু মানুষের ভোটও পেয়েছিলাম। আমি আশাই করিনি, এত মানুষের ভোট পাব। তা ছাড়া আমার বিরুদ্ধে রিগিংও হয়েছিল। তবে হেরে গেলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে নির্দেশে আমায় কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছিল। আমি কাজ করে গিয়েছিলাম।

আজ বয়সজনিত কারণে আমি আর সরাসরি কোনও দলের সঙ্গে নেই। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অনেকদিন গুটিয়ে নিয়েছি নিজেকে। মাঝে রটেছিল, আমি নাকি বিজেপিতে যোগ দিচ্ছি। অনেক ফোন পেয়েছিলাম। বিজেপি যে আমাকে তাদের দলে চায়নি, তা নয়। প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু এই প্রায় আশি ছুঁইছুঁই বছর বয়সে পৌঁছে, আমি কোনও রাজনৈতিক দলেই আর যাচ্ছি না।

তা হলে প্রশ্ন করতে পারেন, এই ভোটে আমার প্রার্থনা কী?  সত্যি মন থেকে চাইব একটা কথা। যাঁরাই সরকার গঠন করুন, তাঁরা যেন সাধারণ মানুষের ভালো করেন। মানুষের কথা ভাবেন। ব্যাস, এইটুকুই।