কুড়ির গণ্ডি পেরোলেই অন্ধত্ব নামে দাস পরিবারে

339

আজাদ, মানিকচক : আজব রোগ! বছর ১৪-১৫ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক। কিন্তু বয়স ১৬-১৭ পেরোতেই সকলেই চোখে কম দেখতে ও কম শুনতে শুরু করেন। আর ১৮-২০ হতে হতে সকলে পুরোপুরি দৃষ্টিহীন ও বধির হয়ে যান। এমনই আজব রোগের সাক্ষী হয়ে আছে মানিকচকের ধরমপুর অঞ্চলের একটি পরিবার।

মানিকচকের ছোট ধরমপুর গ্রামে বাস বৈদ্যনাথ দাসের। বয়স বর্তমানে আশি ছুঁইছুঁই। বয়সজনিত কারণে চোখে ঠিকমতো দেখতে পান না। তাঁর ছয় ছেলেমেয়ে রায়চাঁদ, দিলীপ, অনিল, সুনীল, মুখচাঁদ ও কেশবতী বহন করে চলেছেন এই আজব রোগ। চক্ষু বিশেষজ্ঞ মলয় সরকার জানান, রোগটির নাম রেটিনায়টিক সিগমেন্টেশন। এটি একটি জেনেটিক রোগ। প্রথমে এই রোগে আক্রান্তরা রাতের বেলায় কম দেখতে পান। পরে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান। সারা বিশ্বে এই রোগের কোনও চিকিৎসা নেই।

- Advertisement -

বৈদ্যনাথবাবুর ছয় ছেলেমেয়ে মধ্যে রায়চাঁদ ও সুনীলের মৃত্যু হয়েছে। বাকিরা  প্রত্যেকেই অন্ধ ও বধির। বর্তমানে  ভিক্ষা করে তাঁদের চলে। কোনও দিন তো ঠিকমতো ভিক্ষাও জোটে না। কারণ, চোখ দেখে বোঝা যায় না যে তাঁরা অন্ধ। বাইরের গ্রামে ভিক্ষে করতে গেলে ভিক্ষাও পান না। তাই গ্রামের আশেপাশেই ভিক্ষে করে দিন কাটে তাঁদের। কথা হচ্ছিল বৈদ্যনাথবাবুর ছেলে মুখচাঁদের সঙ্গে। ঘরের সামনে বসে পাট পাকিয়ে দড়ি তৈরি করছিলেন তিনি। কীভাবে দিন কাটছে জানতে চাইলে নীচু স্বরে আক্ষেপের সুরে জানালেন, ‘বেশিরভাগ সময় বাড়িতেই বসে থাকি।  খাটতে পারি না। মানুষ ভালো ভিক্ষা দেয় না। দুই টাকা, এক টাকা দেয়। তাতে এখন আর কিছু হয় না। রেশনের চাল পাই বলে খেতে পাই।’ দিলীপ ও অনিলের  অবস্থাও একই রকম। বৈদ্যনাথবাবুর মেয়ে কেশবতী সকলের বড়। বয়স মোটামুটি ৫০ থেকে ৫৫। পাশের গ্রামে বিয়ে হয়েছিল তাঁর। কিন্তু বিয়ের বছর খানেক কাটতে না কাটতেই আজব রোগের শিকার হয়ে অন্ধ হয়ে যান কেশবতী। কেশবতীকে তাড়িয়ে দেন শ্বশুরবাড়ির লোকজন। সেই থেকে কেশবতীর ঠিকানা বাপের বাড়ি।

তবে গরিব হলেও দমে জাননি বৈদ্যনাথবাবু। ছেলেমেয়েদের চিকিত্সার জন্য ছুটে বেড়িয়েছেন সর্বত্র। চিকিৎসার জন্য শেষ সম্বল জমিটিও বিক্রি করে দিয়েছেন। মালদা, কলকাতা, পূর্ণিয়া, নেপাল সব জায়গায় ছেলেমেয়েদের নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন বৈদ্যনাথবাবু। কিন্তু লাভ হয়নি। চিকিৎসা জোটেনি কোথাও। শেষমেশ হাল ছেড়ে দিয়েছেন। শীর্ণকায় বৈদ্যনাথবাবুর দেহে মাংসটুকু আছে কি না বোঝার উপায় নেই। শরীরের চামড়া ঝুলে গিয়ে। ঘরের বাঁশের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে বলতে অঝোরে কাঁদতে শুরু করলেন। বললেন,  ‘আর কষ্ট দেখা যায় না। কষ্ট সহ্য না করতে পেরে ওদের মা তো বহুদিন আগেই চলে গেছেন। কিন্তু আমার মরণ হয় না। কেমন করে এঁদের দিন চলবে, কী  করে চিকিৎসা হবে এই চিন্তায় ঘুম আর আসে না। চোখের সামনে দুটো ছেলে খেতে না পেয়ে কষ্ট পেয়ে মরে গেল। কিছু করতে পারলাম না।’ আবার অঝোরে কাঁদতে লাগলেন বৈদ্যনাথবাবু। কিন্তু তাঁদের কান্না শোনার জন্য কেউ নেই। কারণ, এই অসহায় পরিবারের পাশে এখনও পর্যন্ত দাঁড়াতে দেখা যায়নি প্রশাসনকে। মেলেনি কোনওরকম ভাতা বা সরকারি সাহায্য। স্থানীয় কয়েক জনের সাহায্যে দুজনের অন্ধত্বের শংসাপত্র জুটলেও বাকি দুজন পুরোপুরি অন্ধ ও বধির হওয়া সত্ত্বেও এখনও বঞ্চিত। গত মাসে বৈদ্যনাথবাবুর কপালে জুটেছে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার ঘর। কিন্তু মাথা গোঁজবার ঠাঁই হলেও পেটের জ্বালা কে মেটাবে?

গ্রামের বাসিন্দা অনিমেষ দাস জানান, এঁদের বাবা-মা দুজনেই স্বাভাবিক ছিলেন। কিন্তু কেন যে তাঁদের সন্তানদের এই আজব রোগ হল, তা কারও জানা নেই। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল যে, দেখে বোঝার উপায় নেই এঁরা দৃষ্টিহীন। আর এটাই সবচেয়ে বড় দোষ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁদের কাছে। এলাকায় ভিক্ষে পান না। তাই গ্রাম থেকে টাকা উঠিয়ে ভিক্ষে করার জন্য এঁদের মুম্বই পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সেখানেও একই ঘটনা ঘটে। অন্ধ বলে বিশ্বাস করতে না পেরে সেখানেও তাঁরা ভিক্ষে পান না। ফলে খালি হাতেই এঁরা গ্রামে ফিরে আসেন। জেলা সভাধিপতি গৌরচন্দ্র মণ্ডল জানান, ‘আপনাদের মাধ্যমেই ঘটনাটি জানতে পারলাম। আমার কাছে এই ব্যাপারে আগে কেউ আসেননি। সত্যিই খুব মর্মান্তিক ঘটনা। প্রথমেই ওই পরিবারের চক্ষু পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খতিয়ে দেখে সবরকম সরকারি সাহায্যও করা হবে।’