চিকিৎসকরা রোগী দেখতে ভয় পাচ্ছেন কেন?

426

চিকিত্সকদের নৈর্ব্যক্তিক মানসিকতা নেই বলেই এত বিরুদ্ধ পরিস্থিতি সত্ত্বেও সামনের সারি থেকে পিঠটান দেননি এখনও। তবে জীবন যখন জীবিকার চেয়ে দামি হযে দাঁড়ায়, পরিবারের নিরাপত্তার প্রশ্ন যখন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সামগ্রিক বিচারে সমস্ত দায় তাঁদের ঘাড়ে চাপিয়ে উদাসীন থাকাটা কি যুক্তিসম্মত? লিখেছেন ডাঃ দেবব্রত রায়।

সময়টা নিশ্চিতভাবে খারাপ যাচ্ছে সবারই। করোনা ভাইরাস যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে স্বস্তিতে থাকতে পারছেন না কেউ। যাঁরা গুরুত্ব বুঝতে পারছেন, তাঁদের কাছে লকডাউন গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে এতদিনে। যাঁদের কাছে লকডাউন মানে প্রশাসনের সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলা, তাঁরা অর্বাচীনের মতো নিজের পায়ে কুড়ুল মারার সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের বিপদে ফেলার ব্যবস্থা করছেন। এর মধ্যে কিছু পেশার মানুষ একেবারে সামনের সারিতে থেকে নিঃশব্দে কাজ করে যাচ্ছেন। বলা ভালো, কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। লকডাউন কিন্তু তাঁদের ঘরের মধ্যে নিশ্চিন্তে থাকতে দেয়নি। যেমন চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মী, অ্যাম্বুল্যান্স চালক, চিকিত্সা পরিষেবার সঙ্গে সরাসরি জড়িত অন্যান্য সকল স্তরের কর্মী, ওষুধের দোকানের কর্মচারী, পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মী। এছাড়াও বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত কর্মী, ব্যাংককর্মী, গণবণ্টন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত কর্মী, অনলাইন পরিষেবা কর্মী প্রমুখ। প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মী, আধিকারিকরা তো আছেনই। বাস্তব পরিস্থিতি মাথায় রেখে সে কারণে লকডাউনে এঁদের ছাড় দেওয়া হয়েছে। এই ছাড় ব্যক্তিস্বার্থে নয়, জনস্বার্থে। একটি প্রশ্ন উঠেছে যে, অধিকাংশ চিকিত্সক এই সময়ে তাঁদের ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখছেন না কেন? প্রশ্নটি একেবারে প্রাসঙ্গিক। যেখানে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা রাষ্ট্রের সব মানুষকে বিনামূল্যে চিকিত্সা পরিষেবা দিতে অপারগ, সেখানে এই পরিস্থিতিতে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, সংগতও বটে।

- Advertisement -

 

এখানে স্মরণে রাখা দরকার যে, আমাদের দেশে চিকিত্সক মূলত পাঁচ ধরনের। একদল ডাক্তার শুধু সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা করেন। কিছু ডাক্তার শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। কিছু চিকিত্সক সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতাল- দুই জায়গাতেই যুক্ত। কিছু চিকিত্সক শুধুমাত্র প্রাইভেট চেম্বারে রোগীর চিকিত্সা করে, তাঁরা কোনও হাসপাতাল বা নার্সিংহোমের সঙ্গে যুক্ত থাকেন না। আরেক শ্রেণির ডাক্তার স্বাস্থ্য-প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত। এঁদের বলা যায় প্রশাসক-চিকিত্সক। এঁরা সাধারণত চিকিত্সায় সরাসরি যুক্ত থাকেন না। স্বাস্থ্য-প্রশাসন চালানোই তাঁদের কাজ। প্রশ্নটি উঠেছে সেইসব চিকিত্সকদের নিয়ে যাঁরা বেসরকারি স্তরে চিকিত্সায় যুক্ত। এতদিন এই প্রশ্ন কেউ করেননি। কেননা, তখন পৃথিবীর সমস্ত কাজকর্ম আপন ছন্দে চলছিল। করোনা না এলে নিশ্চিতভাবে এখন এ প্রসঙ্গ আসত না। ইতিপূর্বেও নানা সময়ে নানা জাযগায় বিভিন্ন প্রয়োজনে (যেমন বন্যা, খরা, আয়লা, সুনামি, ভূমিকম্প, রেল বা বিমান দুর্ঘটনা, প্লেগ মহামারির মতো এমন অনেক কিছু) ডাক্তারদের এবং চিকিত্সাকর্মীদের এভাবে কাজ করতে হয়েছে। সেসব ছিল স্বল্প সময়ে জন্য এবং কোনও একটি নির্দিষ্ট জাযগায় সীমাবদ্ধ। কিন্তু করোনার থাবা সর্বব্যাপী এবং সর্বগ্রাসী। সর্বোপরি এই রোগের গতিবিধি, চালচলন, একজনের থেকে অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে যাওযার মাধ্যম নিয়ে প্রতিনিয়ত ধোঁয়াশা ইত্যাদি সমস্যাকে গভীরতর করেছে। সে কারণে সমস্যাটি একেবারে গোড়ায় গিয়ে ধাক্কা মেরেছে।

শত্রু যেখানে অদৃশ্য এবং পরম পরাক্রমশালী এবং গতিবিধি অজানা, সেখানে চাণক্য-বচন মেনে আবডালে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করছেন অনেকে। সবাই অবশ্য নন। একথা এখন কারোর অজানা নেই যে, করোনা সংক্রমণে বিপদ বেশি পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষের। পশ্চিমবঙ্গের চিকিত্সকদের ২৩ শতাংশ কিন্তু এই বয়সসীমা ছাড়িয়ে গিয়েছেন। সুতরাং, বিজ্ঞানশাস্ত্র মতে, তাঁদের আক্রান্ত হওযার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কো-মরবিডিটি বলে একটি শব্দ খুব শোনা যাচ্ছে আজকাল। কো-মরবিডিটি কথার অর্থ একজনের শরীরে এক রোগের সঙ্গে অন্য এক বা একাধিক রোগের সহাবস্থান। কোভিড-১৯ সংক্রমণে মৃত্যুর কারণ হিসেবে এই কো-মরবিডিটি তত্ত্ব অনুযায়ী বলতেই হয় যে, অনেক চিকিত্সক যেহেতু ডায়াবিটিস এবং হৃদরোগে (কোভিডের ক্ষেত্রে যা মারাত্মক সহযোগী) ভুগছেন, তাই তাঁদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বলতে পারেন, যাঁদের করোনার উপসর্গ নেই, তাঁদের দেখতে আপত্তি কোথায়? সকলের জ্ঞাতার্থে জানাই, উপসর্গহীন সংক্রামিত মানুষ রোগ ছড়ানোয় আদর্শ, এ কথাও কিন্তু চিকিত্সাশাস্ত্র বলছে। এটুকু পড়ে কেউ ভেবে বসবেন না যে, নিজেদের কোলে ঝোল টানার চেষ্টা করছি।

চিকিত্সকদের নিয়ে লেখা এই অংশটুকু ভনিতা মাত্র। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে প্রতি ১,৪৪৫ জনসংখ্যায় ডাক্তারের সংখ্যা মাত্র একজন। পশ্চিমবঙ্গে এই অনুপাত ১,৮৫০ জনসংখ্যা পিছু একজন। তার মানে একজন সরকারি বা বেসরকারি চিকিত্সককে গড়ে এতজন মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হয। ভয়টা সেখানেই। কোনও কারণে একজন চিকিত্সক সংক্রমিত হলে মুহূর্তের মধ্যে একটি বড় জনসংখ্যা সংক্রামিত হয়ে পড়বেন, যা এক ভয়ংকর পরিণতির সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে আমাদের। যা সামলানোর মতো পরিকাঠামো এখনও আমাদের কাছে নেই।

প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে সরকারি ক্ষেত্র চলছে কীভাবে? সরকারি কর্মচারীদের মতো রাষ্ট্রের অধীন হাসপাতালে নিযুক্ত ডাক্তারদের কিছু সরকারি নিয়মনীতি মেনে চলতে হয়। সেখানে ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনও দাম নেই। সরকারি নির্দেশিকা সেখানে শেষ কথা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাস্থ্য যেখানে মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে, সেখানে রাষ্ট্রপোষিত পরিষেবা সংকুচিত করা যায় না। অন্যদিকে, ব্যক্তিগত চেম্বারে সরকারি নিযন্ত্রণ থাকলেও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নির্দেশিকা তেমনভাবে কার্যকর করার ক্ষেত্রে কিছু কিছু জটিলতা এবং প্রতিবন্ধকতা থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি নির্দেশিকা অনুসারে চেম্বারে সবার মধ্যে নির্ধারিত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সত্যিই একটি বড় সমস্যা। যানবাহনের অপ্রতুলতার কারণে প্রত্যেক রোগী চান, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে। ফলে অনেক চেম্বারেই গাদাগাদি ভিড় লেগেই থাকে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা তো দূরস্থান! বাস্তবে পরিস্থিতি এবং পরিকাঠামোর অপ্রতুলতার প্রসঙ্গটি মাথায় রাখতে হবে।

প্রত্যেক রোগী দেখার পর তাঁর সংস্পর্শে আসা সমস্ত যন্ত্রপাতি স্যানিটাইজ করাও কিন্তু খুব সহজ কাজ নয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, উপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে রোগী দেখতে অসুবিধা কোথায়? প্রতিরোধক ব্যবস্থা বলতে সেই বিতর্কিত পিপিই বা পার্সোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট কিট, সরকারি স্তরে যার সরবরাহ অপ্রতুল। এই পরিস্থিতিতে সরকার তা বেসরকারি চিকিত্সকদের সরবরাহ করবে, এমন ভাবনা এখন বিলাসিতা মাত্র। বাকি রইল স্ব-উদ্যোগে জোগাড় করা। এতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু সমস্যা সেখানেও।

কলকাতায় কিনতে পাওয়া গেলেও পরিবহণ সমস্যার কারণে উত্তরবঙ্গে এখনও তা অমিল। চেষ্টা চলছে সংগ্রহের। এর কোনও একটি জায়গায় বিন্দুমাত্র ত্রুটির কারণে সংক্রমণ বেড়ে গেলেই আঙুল উঠছে ডাক্তারদের দিকে। এতসব বিরুদ্ধ পরিস্থিতি সত্ত্বেও ডাক্তারবাবুরা কিন্তু সবাই নিস্পৃহ হয়ে বসে নেই। প্রাইভেট চেম্বারে চিকিত্সা অনেকেই করছেন। কিন্তু কোনও একজন চিকিত্সক বা স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করতে গিয়ে সংক্রামিত হয়ে গেলে তাঁর এবং তাঁর পরিবারকে যেভাবে সামাজিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হচ্ছে, তাতে আতঙ্কিত হওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ আছে বৈকি। সদ্য সদ্য হুগলির কোন্নগরে সরকারি চিকিত্সক দম্পতি ও তাঁদের পরিবারের ওপরে যে ভয়ংকর মানসিক নির্যাতন হয়েছে, কোনও চিকিত্সক তা ভুলতে পারছেন না। ভুলতে পারছেন না সেই ঘটনা, যেখানে এই দুঃসময়ে একটানা এক মাস মালদা হাসপাতালে কাজ করে কলকাতায় নিজের ফ্ল্যাটে ফিরলে যেখানে মহিলা চিকিত্সকের পরিবারকে তালা দিয়ে আটকে রাখেন প্রতিবেশীরা।

নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এ সব অবিবেচকের মতো আচরণ করা প্রতিবেশীরাই কোনও না কোনও সময়ে এই নির্যাতিত পরিবারদের কাছ থেকে চিকিত্সা সংক্রান্ত সাহায্য নিয়েছেন। তাহলে এখন এই বিরূপ আচরণ কেন? পালটা প্রশ্ন তো উঠতেই পারে। এখানেই কিন্তু শেষ নয়। যেসব চিকিত্সক বা স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্তদের চিকিত্সা করছেন, তাঁদের কোথাও কোথাও ভাড়াবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করছেন বাড়ির মালিকরা। আশার কথা এই যে, বেশিরভাগ জায়গায় এমন ঘটনায় প্রশাসন চিকিত্সক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু তাতেই সমস্যা মিটবে না। জনচেতনা না থাকলে এই সামাজিক ব্যাধি আমূল দূর করা সম্ভব নয়।

কাজের সময় কাজি আর কাজ ফুরুলেই পাজি এই চিন্তাভাবনার পরিবর্তন না আনতে পারলে জটিলতা কাটবে না। আরও একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা ভাবার ব্যাপার। এমন কিছু কিছু সমস্যা নিয়ে অনেকে চেম্বারে আসছেন, যা হলে স্বাভাবিক সময়ে ডাক্তার দেখানো তো দূরের কথা, ফার্মাসি থেকেও ওষুধ কিনে খেতেন না। কেন? অতিসচেতনতা? নাকি লকডাউনের মধ্যে বাইরে বেরোনোর ছাড়পত্র (ডাক্তারি প্রেসক্রিপশান) জোগাড়ের প্রয়াস? চিকিত্সকরা কখনও নিজেদের দায়বদ্ধতার কথা অস্বীকার করেন না। এই বিপর্যয়ের সময়ে তো আরও নয়। চিকিত্সকদের সেই নৈর্ব্যক্তিক মানসিকতা নেই বলেই এত বিরুদ্ধ পরিস্থিতি সত্ত্বেও সামনের সারি থেকে পিঠটান দেননি এখনও। তবে জীবন যখন জীবিকার চেয়ে দামি হয়ে দাঁড়ায়, পরিবারের নিরাপত্তার প্রশ্ন যখন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সামগ্রিক বিচারে সমস্ত দায় তাঁদের ঘাড়ে চাপিয়ে উদাসীন থাকাটা কি যুক্তিসম্মত? প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যায়।

ভারতে প্রতি ১,৪৪৫ জনসংখ্যায় ডাক্তারের সংখ্যা মাত্র এক। পশ্চিমবঙ্গে এই অনুপাত ১,৮৫০ জনসংখ্যা পিছু একজন। তার মানে একজন সরকারি বা বেসরকারি চিকিত্সককে গড়ে এতজন মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হয়। ভয়টা সেখানেই। কোনও কারণে একজন চিকিত্সক সংক্রামিত হলে মুহূর্তের মধ্যে অনেকে সংক্রামিত হয়ে পড়বেন, যা এক ভয়ংকর পরিণতির সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে আমাদের।