কেন মানুষ পরিযায়ী,  তাঁরা ফিরলে কেনই বা সমস্যা?

615

সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি : করোনা ভাইরাসের সুবাদে প্রায় দুমাসে আমাদের চারপাশটা কেমন যেন আমূল বদলে গিয়েছে। দেখতে দেখতেই একদিনের জনতা কার্ফিউর হাত ধরে আমরা ঢুকে পড়েছি লকডাউনের নতুন অভিজ্ঞতায়। এরপর গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো এসেছে লাল-কমলা-সবুজ রঙের জোন। কোয়ারান্টিন, হোম আইসোলেশন, মাস্ক, স্যানিটাইজার, সোশ্যাল ডিসট্যান্সের মতো শব্দগুলি আমাদের গা-সওয়া হয়েছে। চড়ক ও নীলপুজোর পর পয়লা ও ২৫শে বৈশাখ মার যাওয়ার দুঃখের মাঝেও বাঙালি সব মিলে একটা নতুন ছন্দ তৈরি করছিল। এরমধ্যেই বাঙালির অভিধানে পরিযায়ী শ্রমিক নামে আরও একটি শব্দ যুক্ত হয়েছে। তাঁদের কেউ হেঁটে বাড়ি ফিরছেন, কেউ সাইকেলে আবার কেউবা কোলে-পিঠে, কাঁধে চড়ে। কারও উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে আস্ত ট্রেন বা বাস। রক্তমাংসের শরীর রেললাইন বা পথে পিষে যাচ্ছে। তবুও এসব নিয়ে নানা মাধ্যমে চর্চা করে ভালোই কাটছিল। ভিনরাজ্য থেকে দল বেঁধে ফেরা এই শ্রমিকদের স্কুল-কলেজে কোয়ারান্টিন সেন্টার করে রাখা হবে বলে যখন জানা গেল তখনই গোলটা বাধল। এলাকায় কোয়ারান্টিন সেন্টার তৈরি রুখতে সোশ্যাল মিডিয়ার সমস্ত প্রগতিশীল ভাবমূর্তি জলাঞ্জলি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া গেল।

কারা এই পরিযায়ী শ্রমিক? এঁরা কি ভিনগ্রহের না ভিনদেশের কেউ! ভেবে দেখুন আসলে এঁরা আমাদের আশপাশের মানুষ যাঁরা পেটের তাগিদে বা বাড়তি রোজগারের আশায় পরিবার-পরিজন বাড়িঘর ছেড়ে গায়ে খাটতে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে ছুটে গিয়েছেন। এঁরা কেউই ইঞ্জিনিযার, চিকিৎসক বা তাবড় শিক্ষিত ডিগ্রিধারী নন। এই সমাজের একেবারেই দরিদ্র অংশের প্রতিনিধি। সামান্য দুচারশো টাকা বেশি দিন হাজিরার টানেই দেশের অন্য প্রান্তে ছুটে গিয়েছেন। এজন্য যদি এঁরা পরযায়ী হন তাহলে অন্যান্য রাজ্যের আইটি হাব বা এসইজেডগুলিতে কর্মরত হাজার হাজার বাঙালি ইঞ্জিনিয়ার, এমবিএ বা চিকিৎসকরা পরিযায়ী। ভেবে দেখুন তো এঁরা বাড়ি ফিরলে কি ভাবনাটা একই রকম হত? তুলনায় অপরিষ্কার পোশাক পরে গায়েগতরে খেটে খাওয়া ঘাম ঝরানো মানুষ বলেই কি এঁদের বাড়ি ফেরা নিয়ে এত সমস্যা? কোনওদিন ভেবে দেখেছেন কেন এঁদের বাড়িঘর ছেড়ে বাইরে যেতে হয়েছে? খুব সহজভাবে বললে আমাদের এরাজ্যে বিশেষত  উত্তরবঙ্গে গত দুই দশকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে কাজের সুযোগ সমানুপাতিকভাবে বাড়েনি। তাই এঁদের ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়া। তবে এতে আখেরে লাভবান হয়েছে এই এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতি বা সার্বিক প্রেক্ষাপটে বললে রাজ্যের অর্থনীতিও।

- Advertisement -

২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিন বছর বয়সি তৃণমূল কংগ্রেসকে ৬০ আসনে আটকে রেখে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ১৯৬টি আসন নিয়ে ফের একবার বামফ্রন্ট সরকার তৈরি হয়। তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী তখনও কৃষিকে ভিত্তি করে শিল্পকে ভবিষ্যত্ করার স্লোগান তোলেনি। সিটু আর কৃষকসভার ওপর ভর করে ভূমি সংস্কার, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা, প্রাথমিক শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ আর সমবায় আন্দোলনের কথা বলেই তখনও বামেদের ভোট জোগাড় হচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবে সময় যত গড়িয়েছে ততই এরাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতি স্থবিরতার দিকে এগিয়েছে। ভূমি সংস্কারের হাত ধরে এক সময় যে জমি গ্রামে বিলি হয়েছিল গরিব মানুষের হাতে তা পরিবারগুলির ভাগ হওয়ায় ছোট ছোট টুকরো হয়েছে নয়তো ঘুরপথে বিক্রি হয়ে জমা হয়েছে এলাকার কোনও ধনী মানুষের হাতেই। ফলে রাজনৈতিকভাবে ভূমি সংস্কারের সুফল প্রচার চললেও জমি থেকে যা আমদানি হচ্ছিল তা দিয়ে পরিবার পালন ক্রমেই দুরূহ হয়ে পড়ছিল। সেই সঙ্গে মানুষের গড় আয় একটা জায়গায় আটকে যাওয়ায় দিনহাজিরা বৃদ্ধির হারও তলানিতে ছিল। এর সঙ্গে আরও একটি সমস্যা যুক্ত হয়। স্কুল শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণের ফলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের মাঝে পড়া ছেড়ে দেওয়ার সংখ্যাটাও বাড়তে শুরু করে। একেবারে নিরক্ষরদের পক্ষে কোদাল কাঁধে জনমজুরি খাটা সহজ হলেও ক্লাস এইট বা নাইন পর্যন্ত পড়া কিছুটা শিক্ষিত যুবকদের পক্ষে স্থানীয় এলাকায় কোদাল-বেলচা হাতে শ্রমিকের কাজে নামাটা সমস্যা হচ্ছিল। এই কারণে মোটামুটি ২০০৩ সালের পর থেকে উত্তরবঙ্গের অনেক যুবক জরি শিল্পের শ্রমিক হিসেবে রাজস্থান, গুজরাট, মরারাষ্ট্র ও দিল্লি পাড়ি দিতে শুরু করেন। বছর পাঁচেক এভাবেই উত্তর ও পশ্চিম ভারতের রাজ্যগুলির দিকে যাওযার ঝোঁকই ছিল বেশি।     (চলবে)