এত ব্যঙ্গ কেন, মন খারাপ উত্তর-পূর্বের ফুটবলারদের

নয়াদিল্লি, ২৬ জুন : গত কয়েক দশকে নিয়মিত প্রতিভাবান ফুটবলার তুলে আনার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সফল উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলি। মণিপুর অথবা মিজোরামের মতো রাজ্য থেকে উঠে এসেছে ঝাঁকে ঝাঁকে ফুটবলার। আইএসএল অথবা আই লিগে সম্ভবত এমন কোনও দল খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে একজনও ফুটবলার নেই। অথচ এই চমকপ্রদ উত্থানের পিছনে লুকিয়ে আছে অনেক চোখের জল ও পদে পদে জাতিবিদ্বেষের শিকার হওয়ার তীব্র যন্ত্রণা। সম্প্রতি সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাই শুনিয়েছেন উত্তর-পূর্ব থেকে আসা একগুচ্ছ ফুটবলার। যাঁরা কিনা দাপিয়ে খেলেছেন দেশের বিভিন্ন ক্লাবে। এঁদের বিষণ্ণ আবেদন, আমরাও কিন্তু ভারতীয়, এই দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের ন্যূনতম সম্মান করতে শিখুন।

কদিন আগে জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক সুনীল ছেত্রী অনলাইনে দীর্ঘ কথাবার্তা বলেছিলেন ক্রিকেট অধিনায়ক বিরাট কোহলির সঙ্গে। সেই সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় এই নেপালিটা আবার কে- এই ধরনের মন্তব্য এসেছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে গোকুলাম কেরালার ফুটবলার মালেমগাম্বা মিতেই বলছেন, আমাদের উত্তর-পূর্ব ভারতের ফুটবলারদের সম্বন্ধে বাকি ভারতবর্ষে এক চরম ঔদাসীন্য ও ঘৃণা কাজ করে। আমরাও কিন্তু ভারতীয়, ভারতের জাতীয় সংগীত আর সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে গেয়ে থাকি। তবে কেন আমাদের প্রতি এই আচরণ? তবে লক্ষ করে দেখেছি যাঁদের বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে উত্তর-পূর্ব ভারতের ছেলেমেয়েরা আছে, তাঁরা কিন্তু এমন ব্যবহার করেন না। আমার মনে হয়, দেশের সমস্ত অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যদি মেলামেশা, সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান বাড়ে, তবে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

- Advertisement -

মহিলা ফুটবলার আশালতা দেবী আদতে মণিপুরের মেয়ে। গত আটবছর ধরে জাতীয় দলের নিয়মিত সদস্য। তাঁর প্রশ্ন, আমাদের মুখের গঠনটা কি অনেকের পছন্দ হয় না? নাহলে কেন মাঠেঘাটে, হাটেবাজারে আমাদের নিয়মিত চিনে, চিঙ্কি ইত্যাদি ডাক শুনতে হয়? অনেকে আবার প্রশ্ন করেন, মণিপুরটা কোথায়? মনে বড় ব্যথা পাই, কষ্ট হয়, কিন্তু কষ্ট চেপেই দিন কাটাই। রেলের চাকরি পেয়ে যখন বিহারের একটি শহরে চাকরিতে যোগ দিতে গেলাম, তখন প্রথম দিনই ব্যাংকের ম্যানেজার আমাকে চিনে বলে অপমান করলেন। প্রতিবাদ করায় জানালেন, তিনি নাকি ঠাট্টা করছিলেন। কই, বিহারের কোনও মানুষকে তো এইভাবে অপমানিত হতে দেখিনি। আশালতার বক্তব্য, জাতিবৈষম্যের শিকার শুধু আমেরিকার কালো মানুষ নন, উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু মানুষও, কিন্তু তাঁদের হয়ে বলার মতো বিশেষ কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

তবে দেশের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলির অপমানিত ফুটবলারদের জন্য একেবারে কেউ বলার নেই, একথাও পুরোপুরি ঠিক নয়। বাংলার ফুটবলার প্রণয় হালদার তীব্র ভাষায় এই আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন। তিনি বলছেন, সেদিন সুনীলভাইকে যেভাবে অপমান করা হল, তার চেয়ে বিশ্রী ব্যাপার কিছু হতে পারে না। এই লোকগুলির অবশ্যই শিক্ষা হওয়া দরকার। মুম্বইয়ে ফুটবলার ড্যারেন কালডেরিয়া পরিষ্কার জানাচ্ছেন, মানুষের জাত তুলে কথা বলা এদেশে একটা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখবেন কিছু লোক আমেরিকা, কানাডায় কী জাতিবৈষম্য হচ্ছে তা নিয়ে কথা বলবে, কিন্তু দেশের ভিতর কী হচ্ছে, তা নিয়ে একেবারে চুপ। কারণ, এরা মনে মনে নিজেরাও জাতিবিদ্বেষী। কিন্তু কবে যে অবসান হবে এই পরিস্থিতির, তা বলতে পারছেন না এঁরা কেউই। মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হবে, এটাই এঁদের একমাত্র আশা।