এক পায়ে তাঁত বোনেন স্ত্রী, ফেরি করেন স্বামী

134

অভিজিৎ ঘোষ, আলিপুরদুয়ার : ১৯৬৪ সালের বলিউড সিনেমা দোস্তির কথা মনে আছে? রামু ও মোহন নামে বিশেষভাবে সক্ষম দুই বন্ধুর গল্প। রামুর চলাফেরায় সমস্যা আর মোহনের দৃষ্টিশক্তিতে। দুই বন্ধুর একজন দারুণ গান করত আরেকজন বাজাত খুব ভালোভাবে হারমোনিয়াম। এই সূত্রেই দুজন দুজনের একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। দুই বন্ধুর চরিত্রে সুধীরকুমার সাওয়ান্ত আর সুশীলকুমার সোমায়ার অভিনয় আজও অবিস্মরণীয়। সিনেমা তো বাস্তব জীবন থেকেই রূপ পায়। কে জানে দোস্তির নির্মাতারা সেই সময় কালচিনির সারা-সিমনের মতো কাউকে খুঁজে পেয়েছিলেন কি না। রামু-মোহনের মতো সারা-সিমনের সম্পর্কও খুব ভালো বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু। পরবর্তীতে সারা-সিমন পরিণয়ে সুতোয় বাঁধা পড়েন। তার পরের ঘটনাটা যে কোনও বলিউড ফিল্ম নির্মাতাকে অনুপ্রাণিত করার মতোই। বিশেষভাবে সক্ষম সারা এক পায়ে মেখলা তৈরি করেন। স্ত্রীর তৈরি মেখলা নিয়ে সিমন নানা রাভাবস্তিতে ঘুরে ঘুরে ফেরি করে বেড়ান। অলক্ষ্যে জীবনকে উদ্বুদ্ধ করেন।

সারা রাভা আলিপুরদুয়ার জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে কালচিনি ব্লকের উত্তর মেন্দাবাড়ির রাভাবস্তির বাসিন্দা। জন্ম থেকেই একটি পা কাজ করে না। তবে লড়াকু মনটা কখনোই হার মানেনি। মেন্দাবাড়ি স্কুলে পড়াশোনা। তাঁতের কাজ বরাবর ভালো লাগত। কিন্তু প্রথাগতভাবে তা শেখার সুযোগটা কখনোই হয়ে ওঠেনি। প্রতিবেশী বান্ধবী রুবেলা এই কাজ শেখার সুযোগ করে দেয়। বান্ধবীর প্রশিক্ষণে সারা আজ দারুণ তাঁতি। ২০০৯ সাল থেকে একাজের শুরু। মেখলা তৈরি করলেও তা বিক্রিতে অবশ্য গোড়া থেকেই সমস্যা ছিল। তা মেটাতেই যেন সারার জীবনে সিমনের ঢুকে পড়া। সিমন শামুকতলার বাসিন্দা। দুজনের পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। সম্পর্কটার ক্রমশ দৃঢ় হওয়া। বছর ছয়েক আগে দুজনের বিয়ে সিমনও এখন সারার গ্রামেরই বাসিন্দা। সারা মেখলা তৈরি করেন। আর সিমন তা নানা রাভাবস্তিতে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন। দুজনের এই যুগলবন্দির গল্প আজকাল এলাকা ছাড়িয়ে জেলার অনেকাংশে ছড়িয়ে পড়েছে।

- Advertisement -

একটি মেখলা তৈরি করতে সাধারণত যে সময় লাগে, সারা তার থেকে কিছুটা বেশিই সময় নেন।  বলছেন, এক পায়ে কাজ করতে হয় বলে সময় হয়তো বেশি লাগে, কিন্তু কাজের গুণগত মানে কোনও খামতি রাখার সুযোগ দিই না। স্ত্রীর কথায় সায় দিয়ে সিমনের বক্তব্য, ওর শরীরে প্রতিবন্ধকতা থাকলেও মনে তা এতটুকু নেই। ওর মনের জোরই আমাকে জীবনকে আরও ভালোভাবে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। স্ত্রীর কাজেই আমাদের সংসার চলে। দারুণ এক গল্প তৈরি করে সারা-সিমন আরও ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। দুজনের পাঁচ বছরের একটি ছেলে রয়েছে। সে ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করে। ভালোভাবে বড় হয়ে সে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবে বলে দুজনে স্বপ্ন দেখেন।