খাবার জোগাড়ের জন্য শালপাতা আনতে যান উষারানিরা

শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি : পেট চালানোর জন্য জঙ্গলে শালপাতার সন্ধানে গিয়ে কারও হাত ভেঙেছে। কেউ পিছলে পড়ে পা ভেঙে চলার শক্তি হারিয়েছেন। সঙ্গী হিসেবে গিয়ে হাতির মুখে পড়ায় কেউ নিজের স্বামীকে হারিয়েছেন। বয়সের ভারে নত হয়ে পড়লেও প্রায় ছয় মাইল দূরে হেঁটে ফাড়াবাড়িতে গিয়ে শালপাতা সংগ্রহ করে প্লেট তৈরি করে চলেছেন ছোট ফাঁপড়ির বাসিন্দা উষারানি, পাগলিরানি, সারতি হালদাররা।

তবে, আধুনিকতার ছোঁয়ায় ফাইবার কিংবা কাগজ, থার্মোকলের প্লেটের দাপট বেড়ে যাওয়ায় শালপাতার কদর কমেছে। পাতা পাড়তে গিয়ে চোখে নোংরা পড়া অথবা গায়ে শুঁযোপোকা পড়ায় তার বিষে শরীর জ্বালার কষ্টের থেকেও পেটের জ্বালা সীমা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চায়েত অফিসে গিয়ে একাধিকবার বার্ধক্যভাতা, বিধবাভাতার জন্য কাগজ জমা দিলেও কোনো কাজ না হয়নি। ফলে দিনে একবেলা খেয়ে দিন কাটাতে হয় ওই বাসিন্দাদের।

- Advertisement -

ডাবগ্রাম-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত ছোট ফাঁপড়ি গ্রামের মহিলারা শালপাতাকেই নিজের জীবিকা হিসেবে বাছতে শুরু করেন ১৯৮৭ সালে। গ্রামের কিছুটা দূরেই ফাড়াবাড়ি জঙ্গল রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এক ব্যবসায়ী গ্রামে এসে মহিলাদের ওই জঙ্গল থেকে পাতা নিয়ে এসে প্লেট বানানোর প্রস্তাব দেন। ন্যায্য দামে ওই ব্যবসায়ী সমস্তটাই কেনার প্রস্তাব দিলে প্রথমে গ্রামের ছয়জন মহিলা ওই প্রস্তাবে রাজি হন। কিন্তু শুধু শালপাতা আনলেই তো হল না। তাকে প্লেটের আকারও দিতে হবে। এক্ষেত্রেও সেই ব্যক্তিই তাঁদের সাহায্য করেন। এরপর সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে গ্রামে ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। চাহিদা বাড়ায় গ্রামের মহিলাদের একাংশ ওই পেশাকেই জীবন হিসেবে বেছে নেন।

শালপাতা কুড়োতে জঙ্গলে গিয়ে দুর্ঘটনার মুখেও তাঁরা পড়তে শুরু করেন। বর্ষাকালে জঙ্গলে জল জমে থাকায় প্রায়ই পা পিছলে হাত-পা ভাঙতে থাকে উষারানিদের। শত যন্ত্রণা সহ্য করার পরেও দুবেলা ভাত জোগাড়ের টাকা মেলায় সেটা মলমের মত কাজ করত বলে জানালেন বছর পঞ্চাশের সারতি হালদার। তাঁর কথায়, প্রায তিনবছর আগেও ২৭ টাকায় ১০০ প্লেট হিসেবে প্রতি সপ্তাহে পাঁচ থেকে ছয় হাজার প্লেট বিক্রি করেছি। কিন্তু গত তিনবছর ধরে মাসে চার হাজারও প্লেট বিক্রি হয় না। আমার স্বামী দেড়বছর আগে আমার সঙ্গে জঙ্গলে গিয়ে হাতির মুখে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন। কোনোরকমে এক বেলা চিঁড়ে-মুড়ি খেয়ে বেঁচে থাকি।

জঙ্গলে পড়ে গিয়ে এক হাত অকেজো হয়ে যাওয়া বছর পঁচাত্তরের পাগলিরানি রাজবংশীর কথায়, ওই একবেলা খাবারের জোগানের জন্য এখনও জঙ্গলে গিয়ে যতটা পারি শালপাতা নিযে আসি। কী করব সরকার থেকেও কোনো সুযোগসুবিধা পাই না। ভোটের সময় সরকারি উদ্যোগে ঘর বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু ঘর তো দূর, পঞ্চায়েত অফিসে বহুবার বার্ধক্যভাতা, বিধবাভাতার জন্য চিঠিপত্র করে এসেছি। কিন্তু কোনো সুবিধাই মিলল না।

ডাবগ্রাম-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সুধা সিংহ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ২০০৫ সালের পর বিপিএল তালিকায় নতুন করে কোনো নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ওই বয়স্ক মহিলাদের ক্ষেত্রে এরকম কোনো সমস্যা রয়েছে কিনা সেটা আমি খতিয়ে দেখছি। ওই বয়স্ক মহিলাদের জন্য আমরা সবধরনের সহযোগিতার চেষ্টা করছি।