আদর্শ গ্রাম গড়তে উদ্যোগী মহিলারা

দীপঙ্কর মিত্র, রায়গঞ্জ: ভারতে আদর্শ গ্রামের যে স্বপ্ন দেখতেন মহাত্মা গান্ধী, সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে এবারে উদ্যোগী হয়েছে মৌসুমি, লক্ষ্মী, মালেকা, বেগেমারা।

গ্রামের রাস্তাঘাট, আলো, জল নিষ্কাশনের সমস্যা যেমন তাঁরা মেটাচ্ছেন, তেমনি গ্রামের অসহায় অসুস্থ মানুষের বাড়িতে গিয়ে ওষুধপত্র ও ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁরা। গ্রামের কেউ মারা গেলে চাঁদা তুলে দাহ করার ব্যবস্থাও করছেন মৌসুমিরা।

- Advertisement -

শুধু তাই নয়, পরিবারের ছোটখাটো সমস্যা মিটিয়ে দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে গ্রামকে নেশামুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁরা অনেকটাই সফল। গ্রামে মদ, জুয়া বন্ধ করতে লকডাউনের প্রথম দিন থেকেই দিবারাত্র পাহাড়া দিচ্ছেন প্রমীলাবাহিনীর সদস্যরা।

মদ বা নেশাজাতীয় জিনিস এলাকায় বিক্রি পুরোপুরিভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন তাঁরা। মাসখানেক আগে গ্রামে গেলে দেখা যেত একাধিক জায়গায় মদ ও জুয়ার ঠেক। এখন ঠিক তার উল্টো ছবি।

গ্রামের মহিলাদের কৃতিত্বের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন পঞ্চায়েত সদস্য বাপ্পা অধিকারীা। রায়গঞ্জ ব্লকের ১২ নম্বর বরুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের দক্ষিণ গোয়ালপাড়া গ্রামে গেলে এমনই দৃশ্য দেখা যাবে।

আগামী ৩ বছরের মধ্যে আদর্শ গ্রামের তকমা পেতে গ্রামের মহিলারাই দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন। গ্রামের রাস্তাঘাট, জল নিষ্কাশন, আলো, পানীয় জলের সমস্যা মেটানোর পাশাপাশি নেশামুক্ত গ্রাম চান তাঁরা।

গ্রামের অধিকাংশ মানুষ দিনমজুরির কাজ করেন। সারাদিন কাজ করার পর যে পারিশ্রমিক মিলত, তা জুয়া খেলে এবং মদ খেয়ে শেষ করে দিত পুরুষরা। ফলে বাড়িতে অশান্তি লেগেই থাকত। অনেক পরিবার এজন্য ভেঙেও গিয়েছে।

করোনা সংক্রমণ রুখতে লকডাউন শুরু হতেই গ্রামে নেশার ঠেক বেড়ে যায়। সেইসময় প্রমীলাবাহিনীরা জোট বাধেন। প্রায় ৫০ জন মহিলা মিলে গ্রামে নেশার ঠেক বন্ধ করতে দিবা-রাত্র পাহাড়া দেওয়ার পাশাপাশি বাড়ির পুরুষদের কাছে মদ খেয়ে মাতলামি বন্ধের জন্য আবেদন জানান।

এতদিন যারা এলাকায় মদ বা নেশার ঠেক চালাতেন তাদের সতর্ক করে দেন। ইতিমধ্যে তাঁরা এই কাজে অনেকটাই সফল বলে গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে।

এখন গ্রামে কোথাও জল জমলে বা রাস্তা বেহাল হলে, আলো না জ্বললে, পানীয় জল না পাওয়া গেলেই ডাক পড়ে প্রমীলা বাহিনীর সদস্যাদের। প্রমীলা বাহিনীর সদস্যদের নেত্রী সেই সমস্যার কথা পঞ্চায়েত সদস্যের কাছে তুলে ধরেন।

তবে ছোটখাটো সমস্যা হলে লোক দিয়ে তারাই সমাধান করেন। শুধু তাই নয় গ্রামের কেউ অসুস্থ হলে ডাক্তারখানায় নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে বাড়িতে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কাজও তাঁরা করছেন। দুঃস্থ পরিবারের কেউ মারা গেলে নিজেরা চাঁদা তুলে দাহ করার ব্যবস্থাও করছেন মহিলারা।

মৌসুমি রায় নামে এক মহিলা বলেন, শহরের পাশে আমরা থাকলেও নানা সমস্যায় জর্জরিত গ্রামের মানুষ। সেই সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল মদ ও জুয়া। তাই লকডাউনের শুরু থেকে আমরা প্রথমে নেশামুক্ত গ্রাম গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। অনেকটাই সফল হয়েছি। এবার আমরা এই গ্রামকে আদর্শ গ্রাম হিসাবে গড়ে তুলতে চাই। তাই কিছু কিছু দায়িত্ব স্বেচ্ছায় তুলে নিয়েছি। তবে এই কাজে সহায়তা করছেন পঞ্চায়েত সদস্য।

লক্ষ্মী সিং নামে প্রমীলা বাহিনীর সদস্যা বলেন, রাস্তাঘাট, পানীয় জল, আলোর সমস্যা রয়েছে কয়েকটি এলাকায়। আমরা দায়িত্ব নিয়েছি পঞ্চায়েতের মাধ্যমে সমস্যা দূর করব। শুধু তাই নয়, ছোটখাটো সমস্যার জন্য পরিবার যাতে ভেঙে না যায়, সেই দায়িত্ব পালন করছি আমরা। তিনি আরও বলেন, আমরা চাই গ্রামের মানুষ যাতে ভালো থাকে। গ্রামবাসীদের সমস্যা দূর করার জন্য আমাদের এই উদ্যোগ।

বেগেমা খাতুন বলেন, গ্রামের মানুষের কাছে আমাদের প্রথম দাবি নেশামুক্ত সমাজ তৈরির জন্য যারা এগ্রিয়ে আসবে, তাঁদের পাশে আমরা থাকব।কারণ নেশার কারনে গ্রামের মানুষ পিছিয়ে পড়ছে। পরিবারগুলিতে অশান্তি বাড়ছে। তাই আমাদের এই উদ্যোগ।

গ্রামের শিউলি মোহন্ত, মুক্তি বসু, রেজিয়া খাতুন, মালেকা খাতুনেরা নিজেদের পরিবার সামলানোর পাশাপাশি গ্রামের অসহায় মানুষের একমাত্র সম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষক অনুপ পাল, ত্রিদিব মন্ডল, নীতিশ সরকার সহ অনেকেই প্রমীলা বাহিনীর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন। নীতিশ সরকার বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি এই গ্রামকে আদর্শ গ্রাম হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। আশাকরি এবার সেই আশা পূরণ হবে।

গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য বাপ্পা অধিকারী বলেন, গ্রামের মহিলারা ভালো কাজ করছেন। তাঁদের চেষ্টায় গ্রাম নেশামুক্ত হয়েছে অনেকটাই। সেইসঙ্গে গ্রামের ছোটখাটো সমস্যা মেটাচ্ছেন তাঁরাই। ত্রাণ দেওয়ার পাশাপাশি অসুস্থ মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন ওনারা। এমনভাবে চললে আশাকরি আগামী ৩ বছরের মধ্যে আদর্শ গ্রামের তকমা পাব আমরা।