শিলিগুড়ি শহরে মেয়েদের নেশার ঝোঁক বাড়ছে

শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি : সরকারি নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে শহরে তামাকজাত  নেশার সামগ্রী অবাধে বিক্রি হচ্ছে। সেই সামগ্রীর ক্রেতার সংখ্যায় শুধু পুরুষরাই নন, মহিলার সংখ্যাও বাড়ছে। শিলিগুড়ি জেলা হাসপাতালের তামাক নিবারণ কেন্দ্রে প্রতিদিন আসা রোগীদের মধ্যে এমনই অনুপাত পাওয়া গিয়েছে। এমনকি পুরুষ, মহিলার এই সংখ্যার মধ্যে নতুন প্রজন্মও রয়েছে। আর এতেই আশঙ্কায় রয়েছেন চিকিৎসক মহল। তামাকজাত সামগ্রী নিয়মিত সেবনের সঙ্গে মেয়েদের মধ্যে গর্ভধারণ সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলে চিকিৎসক মহলের বক্তব্য। প্যাকেটগুলিতে ক্যানসারের বিবিধ চিত্র থাকলেও নতুন প্রজন্মের বেপরোয়া মনোভাবের পেছনে পারিবারিক সমস্যার পাশাপাশি জীবনযাত্রা একটা বড়ো ভূমিকা নিচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষক মহল। এই পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন, তেমনই নির্দেশিকা অনুযায়ি তামাকজাত সামগ্রীর ব্যবহার ও বিক্রির উপর প্রশাসনের প্রয়োজনীয় নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছে বিভিন্ন মহল।

২০১৩ সাল থেকে রাজ্যে তামকজাত গুটখা বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। গুটখার কোম্পানিগুলি এরপর পানমশলা ও তামাক আলাদাভাবে প্যাকেট করে বিক্রি শুরু করেছে। সম্প্রতি এই নিষেধাজ্ঞা আরও এক বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে। শুধু গুটখাই নয়, সমস্ত স্মোকলেস টোব্যাকো (নস্যি, গুল, খৈনি) বিক্রি ও খাওয়ার উপরই নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। জনবহুল খোলা জায়গায় সিগারেট, বিড়ি বিক্রি ও সেবনের উপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। খাতায়-কলমে এ রকম নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রভাব নেই। শিলিগুড়ি জেলা হাসপাতালের তামাক নিবারণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান আরও ভয়ানক। প্রতিদিন তামাকজাত রোগে আক্রান্ত হয়ে এবং বিভিন্ন বিভাগ থেকে রেফার হয়ে ১০ থেকে ১২ জন আসছে। ১০ জনের হিসেব ধরলে এই অনুপাত দাঁড়ায় ৪ জন পুরুষ ও ৬ জন মহিলা। এই পরিসংখ্যান দেখেই চিকিৎসক মহল উদ্বিগ্ন।

- Advertisement -

শহরের বিশিষ্ট চিকিৎসক শঙ্খ সেন বলেন, মেয়েদের মধ্যে এই তামাকজাতীয় নেশার প্রতি আকর্ষণ বাড়ায় তাঁদের মধ্যে গর্ভধারণ সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বাচ্চা পেটের মধ্যেই মারা যাওয়ার পাশাপাশি সময়ে আগে প্রসবের ঘটনা ঘটছে। এমনকি শিশুর মধ্যে কোনো কিছু বোঝার ক্ষমতা কমছে। তাছাড়া মহিলা, পুরুষ নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রেই স্মোকলেস টোব্যাকো সেবনের পরিণতিতে গলা, মুখ, জিভের ক্যানসারের প্রবনতা বাড়ছে। সিগারেট, বিড়ি সেবনের ফলে ফুসফুসে ক্যানসার হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মধ্যে এই প্রবণতা বাড়তে থাকাটা ভবিষ্যতের জন্য আশঙ্কার।

মনোবিদ ডাঃ শান্তনু দে বলেন, একবার এই নেশা ধরলে তা ছাড়তে গেলেই ঘুম না আসা, কোনো কাজে মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটার মতো সমস্যা হচ্ছে। ফলে কোথাও ওঁরা আষ্টেপৃষ্ঠে এই নেশার জালে জড়িয়ে পড়ছেন। এর পেছনে পারিবারিক বিষয়কেই দায়ী করছেন শিলিগুড়ি বিবেকানন্দ বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক মহিতোষ দাস। তিনি বলেন, আমি দেখেছি মেয়ে ও ছেলেদের নেশার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার পেছনে পারিবারিক বিষয়টি একটা বড়ো কারণ। অনেক সময়ে পারিবারিক সমস্যার কারণে মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হয়ে ছেলেমেয়েরা এই ধরনের নেশার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।

মার্গারেট সিস্টার নিবেদিতা ইংলিশ স্কুলের শিক্ষক বিশ্বজিৎ রায় বলেন, পারিবারিক জীবনযাত্রাও কিন্তু একটা বড়ো কারণ। একটা ১২ বছরের ছেলের বা মেয়ে সিগারেট কিংবা গুটখা খাওয়া মানে ছোটোবেলা থেকে সে সেই জিনিসটা বাড়িতে কিংবা বাড়ির আশপাশে দেখে আসছে। বিভিন্ন পরিবারের অতিরিক্ত আধুনিক জীবনযাত্রাও কিন্তু একটা কারণ। এরমধ্যেই নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও প্রকাশ্যেই এগুলি বিক্রি চলছে। সচেতনও ঠিকমতো করা হচ্ছে না। সব মিলিয়ে একেবারে জলে ভাসছে নতুন প্রজন্ম।

শিলিগুড়ি পুরনিগমের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিভাগের মেয়র পারিষদ শংকর ঘোষ বলেন, আমরা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে এ ব্যাপারে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সচেতনতা অভিযান চালাচ্ছি। তবে শুধু নির্দেশ জারি করাই নয়, প্রশাসনের উচিত নির্দেশিকা অমান্য করে তামাকজাত সামগ্রী বিক্রির উপর নিয়মিত অভিয়ান চালানো। দার্জিলিং জেলার উপমুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক (২) ডাঃ তুলসী প্রামাণিক বলেন, স্বাস্থ্যবিভাগ, এনফোর্সমেন্ট বিভাগ ও মহকুমাশাসকের অফিস থেকে যৌথভাবে আমরা বিভিন্ন দোকানে গিয়ে স্মোকলেস তামাকের বিক্রির উপর অভিযান চালাচ্ছি। পাশাপাশি পাবলিক প্লেসে সিগারেট, বিড়ি বিক্রির বিরুদ্ধেও অভিযান চালানোর পাশাপাশি কেউ পাবলিক প্লেসে বিড়ি, সিগারেট সেবন করলে তাঁকে ফাইন করা হচ্ছে। এমনকি সরকারি প্রত্যেকটি দপ্তরে এ বিষয়ে সচেতনতামূলক বোর্ড লাগানোর পাশাপাশি শহরের প্রত্যেকটি স্কুলে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো হচ্ছে।