‘বাম্পার টিমে’ এসইউভি, চাপ বাড়ল বনকর্মীদের

399

বীরপাড়া: আগে ছিল ঠেলাভ্যান। পরে এল যন্ত্রচালিত ভ্যান বা ভুটভুটি। এরপর তিরিশ চল্লিশ হাজার টাকা মূল্যের চার চাকার লজঝড়ে গাড়িতে কাঠ পাচার শুরু হল। তবে এখন আলিপুরদুয়ার জেলার বীরপাড়া সহ সন্নিহিত এলাকায় কাঠ পাচারে এসইউভিও কাজে লাগানো হচ্ছে। সোমবার রাতে বীরপাড়া থানার পুলিশ ও দলগাঁও রেঞ্জের কর্মীরা দলমোর গারোবস্তি এলাকায় একটি এসইউভি গাড়িতে সেগুন গাছের গুঁড়ি পাচার করার সময় সেটিকে বাজেয়াপ্ত করেন।

বন দপ্তর সূত্রের খবর, প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার টাকা মূল্যের বেআইনিভাবে কাটা সেগুন গাছের গুঁড়ি সহ গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তবে কাঠ পাচার চক্রের লোকজন যে এসইউভি গাড়ি ব্যবহার করতে শুরু করেছে তা সামনে আসতেই বনকর্মীদের মানসিক চাপ বেড়েছে।

- Advertisement -

কারণ, তাড়া করে ভুটভুটি বা লজঝড়ে গাড়ি আটকানো যতটা সহজ, এসইউভি আটকানো ততটা সহজ নয়। সোমবার রাতেও পুলিশ ও বনকর্মীদের ফাঁকি দিয়ে পালাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়তে যাচ্ছিল এসইউভি গাড়িটি। তবে সেটিকে আটকানো সম্ভব হলেও চম্পট দেয় পাচারকারিরা, দাবি বন দপ্তরের। দলগাঁওয়ের রেঞ্জার দোরজি শেরপা বলেন, ‘এর আগে এসইউভি গাড়িতে গাছের গুঁড়ি পাচার করার বিষয় সামনে আসেনি।’

তথ্য বলছে, বীরপাড়ার আশেপাশের চা বলয়ে সন্ধ্যে হলেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ‘ওরা’। সাথে নিদেনপক্ষে একখানা করে খুকরি তো থাকেই! এমনকি, ওদের পকেটে ‘ঘোড়া’ থাকে বলেও সন্দেহ করেন বনকর্মীরাই। ‘ঘোড়া’! অর্থাৎ, ছোটো আগ্নেয়াস্ত্র। আর এলাকায় ওরা পরিচিত ‘বাম্পার টিম’ হিসেবে। দলমোর সহ বীরপাড়ার উত্তরাংশে চা বলয়ে এখন ওদেরই রাজত্ব চলে বলে স্বীকার করেন অনেকেই।

সন্ধ্যের পর বীরপাড়ার চা বলয়ে ‘বাম্পার টিমের’ এক এক সদস্যই যেন এক একজন ‘বেতাজ বাদশাহ’! স্থানীয়রাই জানান, বীরপাড়ার আশেপাশের এলাকাগুলিতে আজকাল সন্ধ্যে হতেই রাস্তায় নেমে পড়ে ‘অন্যরকম লোকজন’। তবে, চোখের সামনে দিয়ে অমন লোকজন গাছের গুঁড়ি নিয়ে গেলেও ট্যাঁ ফোঁ করতে পারেন না কেউই। বীরপাড়ার এক বাসিন্দার কথায়, ‘ওদের দিকে তাকাতে নেই। তাকানোর নিয়ম নেই! নিজেকে নিরাপদে রাখতে গেলে ওই নিয়ম মানতেই হবে। কে আর যেচে বিপদে পড়তে চায় বলুন।’

বন দপ্তরের অভিযান অবশ্য বন্ধ নেই। একের পর এক অভিযানে ধরা পড়ছে গাড়ি, বেআইনিভাবে কেটে আনা গাছের গুঁড়ি। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধরা পড়ছে না কেউ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বনকর্তাদের এক বুলি, ‘এ ঘটনায় কাউকেই ধরা সম্ভব হয়নি।’ অনেক ক্ষেত্রে বলা হয়, ‘গাড়ি ফেলেই চম্পট দেয় পাচারকারিরা। তাদের খোঁজ চলছে।’ খোঁজ অবশ্য আর মেলেই না। স্থানীয়দের কাছে একটাই জবাব মেলে, ‘আরে মশাই, ওদের মাথার ওপর দাদাদের হাত রয়েছে।’ ‘দাদা’, কারও ভাষায়, ‘বড়ে ভাই’ অর্থাৎ রাজনৈতিক দলের নেতা। রাজনৈতিক দলের নেতার আশীর্বাদ থাকলে নাকি ওই এলাকায় বুক ফুলিয়েই বেআইনি কাঠের ব্যবসা করা যায়। শুধু ব্যবসাই নয়, উলটে শাসানো যায় বনকর্মীদেরই। অবশ্য, কাঠ মাফিয়াদের সহযোগিতা করার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে সব রাজনৈতিক দলই।

এ প্রসঙ্গে মাদারিহাটের বিধায়ক তথা বিজেপির রাজ্য কমিটির স্থায়ী সদস্য মনোজ টিগ্গা বলেন, ‘কাঠ পাচারের মতো বেআইনি কাজে জড়িতদের প্রতি কোনওরকম সহানুভূতি দেখানো বা মদতের প্রশ্নই ওঠে না। বরং বীরপাড়ার একটি স্কুলের গাছ কাটার ব্যাপারে আমি মামলা দায়ের পর্যন্ত করেছি।’

তৃণমূলের মাদারিহাট বীরপাড়া ব্লক কোর কমিটির সদস্য জয়প্রকাশ টোপ্পো বলেন, ‘এ ধরনের কার্যকলাপে জড়িতদের মদতের প্রশ্নই নেই।’ বীরপাড়া থানার ওসি পালজার ভুটিয়া বলেন, ‘বনকর্মীদের সঙ্গে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশও। কয়েকদিন আগে সরুগাঁও বস্তিতে দুই পাচারকারিকে বমাল গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’