ভয় বুকে নিয়ে সেবকের টানেলে চলছে কাজ

290

শমিদীপ দত্ত, সেবক : সকাল তখন এগারোটা। শুনসান সেবক রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে একটি মালগাড়ি। স্টেশনের পাশেই টানেলের পাইপ থেকে আসছে কাজের আওয়াজ। হঠাৎ করেই কানে এল, ভালো করে হেলমেট পরো। নজর গেল টানেল থেকে কয়েক পা দূরে অস্থায়ী টিনের ঘরটার দিকে। কয়েকজন শ্রমিক সেখানে ট্রাক থেকে সিমেন্টের বস্তা নামাচ্ছেন। তদারকি করছেন বিধননগরের বাসিন্দা বিশ্বজিৎ দাস। তিনিও শ্রমিক। সতর্কবার্তাটা তাঁরই। কথা বলার আগেই ফোন বেজে উঠল বিশ্বজিতের। ফোন ধরে বললেন, মা, আমি ভালো আছি। এখানে কিছু হয়নি। বোঝা গেল, আটদিন আগের ভালুখোলা দুর্ঘটনার আতঙ্ক এখনও মন থেকে সরেনি বিশ্বজিৎদের পরিবারের।

তাঁরা কি এখনও আতঙ্কে রয়েছেন? উত্তরপ্রদেশের গোরখপুর থেকে আসা রাজীব শুক্লা, অসমের বরপেটার বাসিন্দা সজল হকরা একসুরে বললেন, এই কাজে জীবনের কোনও নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু কাজ করে যে টাকা পাই, তার ওপর আমাদের পরিবারের ভাত জোটা নির্ভর করছে।

- Advertisement -

টানেলে কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার মুখে পড়ার আশঙ্কা রাজীবদের চোখেমুখে স্পষ্ট। ভালুখোলার ঘটনা সেই আশঙ্কা আরও বাড়িয়েছে। কিন্তু পেটের দায় বড় দায়। সেবক ও রংপোর রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ করতে তাই একজোট হয়েছেন বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকরা। বিশ্বজিৎ বলছিলেন, এখানকার শ্রমিকদের অধিকাংশই এসেছেন অসমের বরপেটা থেকে। তবে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, অন্ধ্রপ্রদেশ ছাড়াও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকেও শ্রমিকরা এই দুই টানেলের কাজ করতে এসেছেন।

সেবক রেলস্টেশন থেকে কয়ে পা দূরেই শ্রমিকদের জন্য কোয়ার্টার তৈরি করেছে বরাতপ্রাপ্ত সংস্থা। ঘরগুলোর অধিকাংশ এখন ফাঁকা। তাহলে শ্রমিকরা কোথায়? রাজীবের জবাব, বাকিরা লকডাউনের কারণে বাড়িতে গিয়েছেন। সেবকের এই শ্রমিক কোয়ার্টারে প্রায় ২০০ শ্রমিক থাকেন। সেবক (টানেল-১) ও কালিঝোরার (টানেল-২) কাজ তাঁরাই করছেন। এখন কোয়ার্টারে ৫০ জন রয়েছেন।

ভালুখোলার সেই দিনের কথা বলতে গিয়ে সজল হকের গলা শুকিয়ে এল, বিকেলের দিকে হঠাত্ই ঘটনার কথা আমাদের কানে এসে পৌঁছায়। শুনে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। পরদিন থেকেই পরিবারের সদস্যদের ফোন আসতে শুরু করে। অশোক শর্মা বলছিলেন, গোরখপুরে আমাদের গ্রামের লোকজন আমাদের ফিরে আসতে বলছিলেন।

কয়েকমাস আগে টানেল-২এ কাজ করার সময়ে ওই এলাকার দুই শ্রমিক গুরুতর চোট পেয়েছিলেন। চোখের সামনে বন্ধুদের চোট পেতে দেখেছিলেন ফজল হক। কাঁপা গলায় বললেন, আইডি ব্লাস্ট করতেই ওপর থেকে পাথর এসে পড়ল। চোট পেয়ে আমার এক বন্ধুর কোমর ভাঙল। আরেক বন্ধু তো রিড বানাতে গিয়ে হাত ভাঙল। আসলে এই কাজে যে কোনও সময়ে যা কিছু হতে পারে।

শ্রমিকদের দেওয়া তথ্য, টানেল-১এর আয়তন লম্বায় ৫.৮ কিলোমিটার। এখনও অবধি ৪০০ মিটার কাজ হয়েছে। টানেল-২এর আয়তন লম্বায় ৯০০ মিটার। তার ২৭০ মিটার কাজ হয়েছে। বিশ্বজিৎকরা জানালেন, দুইবারের লকডাউনে কাজ অনেক পিছিয়ে গিয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সময়ে মধ্যেই কাজ শেষ হবে।

নতুন এই রেলপথকে কেন্দ্র করে বহু পুরোনো সেবকের রেলস্টেশনও উলটোদিকে চলে আসছে। এব্যাপারে ট্যানেল-১ ও টানেল-২এর প্রোজেক্ট  অফিসার অনিল কুমার বলেন, ইতিমধ্যেই নতুন স্টেশনের নকশা হয়ে গিয়েছে। রেল কর্তপক্ষ সবুজ সংকেত দিলেই স্টেশনের কাজ শুরু হয়ে যাবে। তাঁর আশ্বাস, টানেল-১ ও টানেল-২এর সবধরনের টেস্ট হয়ে গিয়েছে। এসব নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।