লকডাউনে কাজ হারাচ্ছেন মালদার শ্রমিকরা

98

হরষিত সিংহ, মালদা : সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাইকেল। প্রতিটি সাইকেলে বাঁধা রয়েছে একটি করে ডালি ও কোদাল। সাইকেলের সামনেই কেউ দাঁড়িয়ে কেউ আবার বসে এদিক ওদিক। সমানে চোখ চালাচ্ছে। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে ওদের দিকে একটু তাকালেই বলতে শোনা যাচ্ছে, বাবু লেবার লাগবে নাকি! এই বলেই এগিয়ে আসছেন তিন থেকে চারজন। সেখানে দাঁড়িয়ে পড়লে ঘিরে ধরছেন ২০ থেকে ৩০ জন একসঙ্গে। আর না দাঁড়িয়ে চলে গেলে মুখ ফিরিয়ে বসে অন্যদের দিকে নজর রাখছেন প্রত্যেকে। সকাল প্রায় সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত এখন রোজ এমনই ছবি ধরা পড়ছে মালদা শহরের সুকান্ত মোড়ে।

করোনা পরিস্থিতিতে অনেকেই কাজ হারিয়েছে। কাজ হারাতে বসেছেন ইংরেজবাজার ব্লকের গ্রামীণ এলাকার বহু শ্রমিক। একসময় মালদা শহরে রাজমিস্ত্রির শ্রমিক থেকে শুরু করে নোংরা পরিষ্কারের কাজ করে দিব্যি তাঁরা সংসার চালাতেন। কিন্তু এখন কাজ নেই। বসে থেকে তাই অপেক্ষা। শুধু সুকান্ত মোড় নয়, বাসস্ট্যান্ড ও পিঁয়াজি মোড়ে এই শ্রমিকেরা জমায়েত হন। সেখান থেকেই আগে তাঁদের কাজের জন্য নিয়ে যাওয়া হত বিভিন্ন বাড়িতে। সকালে না গেলে এই শ্রমিকদের দেখা পাওয়া যায় না। তাই সকালের দিকেই যেতে হয়। এখন অবশ্য অন্য ছবি। করোনার ভয়ে এই শ্রমিকদের আর কেউই নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যেতে চান না। তাই কাজের জন্য চলে অপেক্ষা। প্রতিযোগিতা।

- Advertisement -

কিছুটা আক্ষেপ ও দুঃখের গলায় প্রজেনজিত্ দাস বলছিলেন,চারদিন ধরে কাজ পাচ্ছি না। প্রতিদিন বাড়ি ঘুরে যাচ্ছি। বাড়িতে স্ত্রী ও কোলের ছেলে রয়েছে। কী করে সংসার চালাব, বুঝেই পাচ্ছি না। আমাদের শরীরে নাকি করোনা আছে। তাই কেউ কাজে নিয়ে যাচ্ছে না। আমাদের পরীক্ষা করা হোক, দেখুক আমাদের করোনা আছে কি। এই করোনা পরিস্থিতিতে সরকারও আমাদের কোনও সাহায্য করছে না।

মালদা শহরে রাজমিস্ত্রির কাজ করে পারিশ্রমিক মেলে প্রতিদিন ৩৫০ টাকা। আবার নিজেরাই কোনও কাজ ধরলে ৫০০ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক মেলে। ফের কাজ বন্ধ হয়ে পড়ায় সমস্যায় পড়েছেন বুলেট শেখ। তিনি বলেন,বাড়িতে স্ত্রী সহ দুই সন্তান রয়েছে। করোনার কারণে গত একবছর ধরে কাজ বন্ধ। মাঝে কিছুদিন কাজ হয়েছিল। কিন্তু ইদের আগে থেকে সেই কাজও প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সকালে শহরের কাজ পাওয়ার আশায় চলে আসছি। এদিকে শহরে কোনও কাজ না মেলায় বেলা করে বাড়ি ফিরে সেখানেও কোনও কাজ মিলছে না। তাই কী করব বুঝতে পারছি না। এই লকডাউন পরিস্থিতির মধ্যে তাই ভিনরাজ্যে কাজে যাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই।

এক বছর আগে করোনা পরিস্থিতিতে সরকারি বা বেসরকারিভাবে সাহায্য করা হচ্ছিল। কিন্তু এখন মাসে র‌্যাশনের চাল ছাড়া আর কিছুই মিলছে না। সাইন শেখের কথায়,প্রতিদিন ঘুরে যাচ্ছি। কতদিন এইভাবে চলবে বুঝতে পারছি না। এখানে কাজ পাচ্ছি না। ভিনরাজ্যে যে কাজে যাব সেটারও পথ বন্ধ। গাড়ি, ট্রেন চলছে না। ফলে রাজ্যের বাইরে যেতে পারছি না। হয়তো আগামীতে আমরা না খেয়ে মরে যাব। আমরা চাই একটু সরকারি সাহায্য।