চিনা আগ্রাসনের সমালোচনায় ভারতের পাশে বিশ্ব

483

নয়াদিল্লি: লাদাখে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর দুমাস ধরে উত্তেজনা চলছে। ১৫ জুন গালওয়ান উপত্যকায় চিনের সঙ্গে সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা শহিদ হয়েছেন। শুক্রবার লাদাখ ও লে সফরে যান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি সেনা আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলেন। গালওয়ানে সংঘর্ষে জখম সেনাদের সঙ্গে দেখা করে সাহস জোগান প্রধানমন্ত্রী। প্রশংসায় ভরিয়ে দেন সেনাবাহিনীকে। চিনের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি চিনকে বিস্তারবাদী বা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবেও অভিহিত করেন। প্রধানমন্ত্রীর লাদাখ সফরের পরপরই সেখানে আরও প্রায় ২০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে ভারত।

লাদাখে উত্তেজনার মধ্যেই এবার ভারতের পাশে দাঁড়াল জাপান। অন্যদিকে, শনিবারই দক্ষিণ চিন সাগরে চিনের প্রভাব ঠেকাতে ৬টি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে আমেরিকা। ভারত-চিন টানাপোড়েনের মধ্যে দক্ষিণ চিন সাগরে আমেরিকার নৌবহর পাঠানোর সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি সাউথ ব্লককে স্বস্তি দিয়ে প্রভাবশালী দেশগুলির একাংশ পূর্ব লাদাখে ভারতের অবস্থানকে সমর্থন জানাতে শুরু করেছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় চিন একতরফাভাবে স্থিতাবস্থা নষ্টের চেষ্টা করছে বলে কড়া সমালোচনা করেছেন ভারতে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাতোসি সুজুকি। শুক্রবার বিদেশসচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন সাতোসি। তিনি টুইটে লেখেন, ‘আমরা আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সব সমস্যার সমাধানে বিশ্বাসী। তবে জাপান কখনওই একতরফাভাবে স্থিতাবস্থা নষ্ট করার চেষ্টাকে সমর্থন করে না।’

- Advertisement -

পূর্ব লাদাখের গালওয়ানে চিনা সেনার সঙ্গে সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় জওয়ান শহিদ হওয়ার পর থেকেই দু-দেশের সম্পর্ক ক্রমশ জটিল হচ্ছে। সেনা শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠকেও কোনও সমাধানসূত্র মেলেনি। গালওয়ানে ভারতীয় এলাকার বেশ কিছুটা ভিতরে এখনও ঘাঁটি গেঁড়ে বসে আছে লাল ফৌজ। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর দু-দেশই সেনা, ট্যাংক ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে।

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েকবছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে প্রভাব বাড়িয়ে ভারতকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে চিন। ইতিমধ্যেই বেজিংয়ের ঋণজালে জড়িয়ে গিয়েছে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও মালদ্বীপ। বাংলাদেশকেও নানা সুযোগসুবিধা দিয়ে কাছে টানতে চাইছে চিন। এই পরিস্থিতিতে গত কয়েকদিন ধরে সাউথ ব্লকও ধারাবাহিকভাবে আমেরিকা, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছে।

বুধবার হোয়াইট হাউসের প্রেসসচিব কেলিং ম্যাকেনি লাদাখের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য চিনা আগ্রাসনকে দায়ী করেছেন। ভারতের প্রতি তাঁদের সমর্থন বজায় থাকবে বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্লোরেন্স পার্লি। গালওয়ানে ২০ জন ভারতীয় সেনার শহিদ হওয়ার ঘটনায় গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন তিনি। পার্লি বলেন, ‘এটি ভারতীয় সেনা, তাঁদের পরিবার ও জাতির প্রতি এক কঠোর আঘাত ছিল। এই কঠিন পরিস্থিতিতে আমাদের সরকার ও সেনা ভারতের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে।‘

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনও চিনের আগ্রাসী বিদেশনীতির সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ভারত-চিন সীমান্ত, দক্ষিণ চিন সাগর, ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে উত্তেজনা ক্রমাগত বাড়ছে। শুধু চিন বা আমেরিকা গোটা অঞ্চলের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করবে, সেটা হতে পারে না। ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম সহ সব দেশের স্বার্থের বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। আশিয়ান দেশগুলি ভারত-চিন সংঘাত নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও রাষ্ট্রসংঘের সদস্য অন্তত ১০টি দেশ দক্ষিণ চিন সাগর এবং ভারত মহাসাগরে চিনের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার বিরোধিতা করেছে।

পর্যবেক্ষকদের একাংশের বক্তব্য, দক্ষিণ চিন সাগরে চিন যেভাবে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করতে চাইছে তাতে শুধু এই অঞ্চলের দেশগুলি নয়, আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশেও উদ্বিগ্ন। করোনা সংক্রমণকে কেন্দ্র করে সেই উদ্বেগ ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। উহানে করোনা সংক্রমণ ছড়ানোর পর চিন দীর্ঘদিন সেই খবর চেপে রেখেছিল বলে অভিযোগ উঠেছে অনেক আগেই। বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো খাপ্পা আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। করোনার জন্য একাধিকবার চিনকে দায়ী করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জার্মানি, ইতালি, ব্রিটেনের মতো দেশ করোনা সংক্রমণের উৎস খুঁজতে ইতিমধ্যেই তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

করোনা ঠেকাতে উন্নত দেশগুলির ব্যস্ততার সুযোগে ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, হংকং, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকায় চিনের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টায় আন্তর্জাতিক মহলে ক্ষোভ বাড়ছে।