বিশ্ব সংবাদমাধ্যম দিবস: কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা

78

কলকাতা: অক্সফোর্ড ইংরেজি অভিধান অনুসারে ‘Press is the one that Broadcasts the News’ অর্থাৎ, বার্তা সম্প্রচারক যেকোনও কিছুকেই আমরা বৃহত্তর অর্থে প্রেস বা মিডিয়া হিসেবে পরিগণিত করতে পারি। ধরা যাক, আমরা ২০১২ সালে দাঁড়িয়ে আছি। গোটা বিশ্ব তখন ইউরো জ্বরে কাঁপছে। ২৮ জুন দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছে জার্মানি এবং ইতালি। ঠিক তার আগের দিন, অর্থাৎ ২৭ জুন লন্ডনের বিগব্যানে কিংকংয়ের মুখের বদলে ইতালির ফুটবল ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্ট্রাইকার মারিও বালাতলির মুখ বসানো। ওই দিন ম্যাচের বয়স যখন ৩৬ মিনিট। মাঝমাঠ থেকে বালজারত্তির একটা পাস ধরে ২১ বছর বয়সী ম্যান-সিটির মারিও বালিয়াতলি জার্মান অধিনায়ক ফিলিপ লামকে ঘাড়ে নিয়ে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে টপ অফ দ্য ডি বক্স থেকে গোলার মতো শট রাখলেন তে’কাঠিতে। জার্মান গোলরক্ষক ম্যানুয়াল ন্যুয়ার কিছুটা হতভম্ব, তখন ঘোর কাটেনি সেই গোলের, হয়তো বেখেয়ালই হাত তালি দিয়ে ফেললেন। আর বালাতলি? ছুটে গেলেন গ্যালারির দিকে। জার্সি খুলে কিংকংয়ের ঢঙে দাঁড়ালেন, পিঠে তিনটি নীল স্ট্র্যাপ।

খেলা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মারিও বলেন, ‘আমার দেশের জাতীয় ফুটবল দলের জার্সির রং নীল এবং সাদা। আমার চামড়ার রং সাদা নয়, তাই আমি শুধু নীল স্ট্র্যাপ লাগিয়েছিলাম এটা প্রমাণ করতে যে, চামড়ার রং সাদা না হলেও, নীল এবং সাদা বহন করতে এবং তার জন্য শেষপর্যন্ত লড়াই করতে এবং জয় ছিনিয়ে আনতে আমি একটুও কসুর করি না।’ সেদিন একুশের বালাতলির সেই ভঙ্গী ছিল গতদিনের ইংরেজ অসভ্যতা, বর্ণবিদ্বেষের প্রতি জবাব-বার্তার সম্প্রচার। আরও একটু পিছেয়ে যান, ১৮৫৭ সাল। সিপাহী বিদ্রোহ অন্তিম সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে। বৃদ্ধ বাহাদুর শাহ্ জাফরকে ইংরেজরা বন্দী করে ঘোড়ার গাড়িতে তুলেছে। গাড়ির লোহার গরাদের ফাঁকে মুখ বার করে তিনি দেশবাসীর উদ্যেশ্যে বলছেন, ‘বাগিওমে পু রাহেগি জবতাক ইমান কি, তবতক লন্ডন তক চলেগি তেজ হিন্দুস্থান কি’…স্পষ্ট বার্তা, বার্তার সম্প্রচার।

- Advertisement -

কাট টু ১৯৩৮। চীনের উপর বোমা বর্ষণ করেছে জাপ সাম্রাজ্যবাদীরা। কোলকাতার স্কটিশচার্চ কলেজে বাংলার অধ্যাপকের রেডিওতে সে খবর শুনলেন সেদিনের তরুণ ছাত্রনেতা সুভাষ মুখোপাধ্যায়। একটুও সময় নষ্ট না করে নোটস নেওয়ার খাতায় লিখে ফেললেন, ‘জাপ পুষ্পকে ঝরে ফুলঝুড়ি, জ্বলে হ্যানকাও, কমরেড আজ বজ্র কঠিন বন্ধতা চাও, লালনিশানের নিচে এই উল্লাসী মুক্তির ডাক, রাইফেল আজ শত্রুবধের সম্মান পাক’- সম্প্রচারিত হল বার্তা। স্থান, কাল, পাত্র-তিনটি ক্ষেত্রেই ভিন্ন, প্রেক্ষাপট ভিন্ন কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলাম বার্তা সম্প্রচারের ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট মাধ্যমকে আধার না করা হলেও তিনটি ক্ষেত্রেই বার্তার মধ্যে কোনও অস্পষ্টতা ছিল না এমনকি বার্তাগুলি ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রেও কখনও রক্তাল্পতায় ভোগেনি। আসলে বার্তার সম্প্রচার কখনোই কোনও চোখ রাঙানি অথবা ফান্ডামেন্টালিজম কিংবা ধরুন কোনও ইন্সটিটুশনালিজমের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কিংবা নির্ধারিত হয় না। তার একটা নির্দিষ্ট পথ এবং পন্থা থাকে, সে নিজেই তাঁকে খুঁজে নেয়। যেমন খুঁজে নিয়েছিল ওপারের ওয়াশিকুর রহমান বাবু নিজের ব্লগে কিংবা এপারের গোবিন্দ পানেসারে তাঁর বইয়ে। কিংবা ধরা যাক কাফিল খান তাঁর চিকিৎসায় অথবা গৌরী লংকেশ তাঁর কলামে।

এর ঠিক উলটো পিঠে অবস্থান করে যে কোনও ধরণের এস্টাব্লিশমেন্ট। তারা চায়, বার্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং সম্প্রচারকে নিজের অনুকূলে পরিচালিত করতে। তাই জন্যই মগজধোলাই, এবং সেজন্যই চরণদাসদের শাস্তি। শুধুই কি এইটুকু? না, আরও আছে। একবিংশ শতাব্দীর হীরক রাজারা এই কাজে নিখুঁতভাবে কাজে লাগায় পুঁজিকে। বার্তা সম্প্রচারের তথাকথিত মাধ্যমগুলিকে পুঁজির দ্বারা এমনভাবে হিপ্নোটাইজ করে রেখেছে যে বিশ্বকে পরিচিত হতে হয়েছে এক নতুন শব্দ ‘ইয়োলো জারনালিজম’ এর সঙ্গে। এছাড়াও সোশ্যাল মিডিয়ায় যেভাবে কোনও স্বতঃস্ফূর্ত এক্সপ্রেশন(পছন্দ হোক অথবা না হোক), বাক্য, শব্দ, উক্তি, প্যারোডি, এমনকি ব্যক্তিগত ছবি, রুচি, পোশাক পরিচ্ছদকে জাজ করা হয়, আতশ কাঁচের তলায় ফেলে আষ্টেপৃষ্টে গলা টেপা হয় তাতে সেই মিডিয়া ব্যবহারের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয় বইকি। শুধু তাই নয়, সোশ্যাল মিডিয়াকে যেভাবে উস্কানিমূলক, প্ররোচনামূলক, ভেদাভেদ সৃষ্টিকারী, গুজব ছড়ানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তা ইয়োলো জারনালিজমের তুলনায় কোনও অংশে কম নিন্দার নয় এবং তা অবশ্যই মিডিয়ার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এবং ইউটিলিটিকে সংকুচিত করে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে আজ থেকে হয়তো বছর দু’য়েক আগেও হোয়াটস অ্যাপে একটি মেসেজ একই সঙ্গে অসংখ্য মানুষের কাছে পাঠানো যেত, কিন্তু এই ফিচারের সুবিধা নিয়ে গুজব ছড়ানোর ফলে আজ আর পাঁচজনের বেশি একটি মেসেজ একেবারে পাঠানো যায় না। আপনারাই বলুন সংকুচিত হল কি না?উপসংহার টানতে গিয়ে বলতেই হবে, মিডিয়া বা প্রেস বার্তা সম্প্রচারক মাধ্যম যাই হোক না কেন, ইট হ্যাজ ইটস ওউন পাওয়ার টু কমব্যাট এগেইনস্ট এনি কাইন্ড অফ রং এস্টাব্লিশমেন্ট। তাই নীল দর্পন ব্যান হয়, তাই নাট্য নিয়ন্ত্রণ বিল আসে, তাই এমার্জেন্সি পিরিওডে তাবড় সাংবাদিকের জেল হয়, তাই কার্টুন ফরোয়ার্ড করা অপরাধ হয়, তাই সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার দাবি জানিয়ে মামলা হয়। তবে এতো কিছুর পরও, আরও কিছুটা বেঁচে আছে। ‘সব ফুল ঝরে গেলেও বসন্ত আসবেই, চিলির নেরুদার এই ভাষার সঙ্গে বাংলার জীবনানন্দের’ এই পৃথিবীর রণরক্ত সফলতা সত্য তবু শেষ সত্য নয়, কোলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে, তবু তোমার কাছে আমার হৃদয়’- এই ভাষা যখন মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়, তখনই উদয়ন পণ্ডিতরা সত্যি হয়ে ওঠেন, সফদার হাশমিরা সত্যি হয়ে ওঠেন, রবীশ কুমারেরা সত্যি হয়ে ওঠেন। ‘প্যারট ইন দ্যা কেজ’ নয়, ‘ডেইলি মিরর’ হয়ে উঠুক গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। ১৪২-এ নয়, প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে “ভারত আবার জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে”- এই হোক আজকের শপথ।