চার ইঞ্চির দশভূজার পুজো ঘিরে মাতোয়ারা মেমারির নবস্থা গ্রাম

322

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান: অষ্টধাতুর তৈরি মাত্র চার ইঞ্চি উচ্চতার দেবী দশভূজার মূর্তি। সেই মূর্তির পুজো ঘিরেই দুর্গোৎসবের কটাদিন মাতোয়ারা থাকেন পূর্ব বর্ধমানের মেমারির নবস্থা গ্রামের বাসিন্দারা। বিগত পাঁচশো বছরেরও বেশী সময়কাল নবস্থা গ্রামের দক্ষিণপাড়ার বিশ্বাস পরিবার চার ইঞ্চির অষ্টধাতুর দেবী উমার মূ্র্তি পুজো করে আসছেন। নিজ মাহাত্ম গুণেই এলাকাবাসীর কাছে আরাধ্য দেবী হিসাবে মান্যতা পেয়ে আসছে চার ইঞ্চির এই দশভূজা।

শহর,মফস্বলের বড় বাজেটের থিম ভাবনার পুজো দেখা নিয়ে কোন মাতামাতি নেই নবস্থা গ্রামের বাসিন্দাদের। তারা এখন ব্যস্ত ছোট দুর্গার পুজোর আয়োজনের শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি সেরে ফেলতে। তাই পুরোদমে শুরু হয়েছে বিশ্বাস বাড়ির নাট মন্দির সাজিয়ে তোলার কাজ। নবস্থা গ্রামের বাসিন্দারা মনে করেন নিষ্ঠা ও ভক্তির মেলবন্ধনে হওয়া তাঁদের ছোট্ট দুর্গা মায়ের পুজো থিমের বড় বাজেটের পুজোর থেকেও বেশী নজরকাড়া।

- Advertisement -

নবস্থা গ্রামের রাজারাম বিশ্বাসের বাড়ি লাগোয়া মন্দিরে সারা বছর অধিষ্ঠিত থাকেন চার ইঞ্চির দেবী দুর্গা। পঞ্জিকার নির্ঘন্ট মেনে কোন নির্দিষ্ট দিন বা সময় ধরে নয়। সারা বছরই নিত্যসেবা হয় অষ্টধাতুর এই দুর্গা মূর্তির। নিত্যসেবা সারেন স্থানীয় সালিগ্রাম নিবাসী পুজারী কার্তীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবার সদস্যরা। মহাসপ্তমীর দিন সকালে বিশ্বাস বাড়ির মন্দির থেকে অষ্টধাতুর দশভূজার মূর্তি নিয়ে যাওয়া হয় পরিবারের বড় নাটমন্দিরে। দেবী পক্ষের চারটে দিন নাট মন্দিরেই নিষ্ঠা সহকারে অষ্টধাতুর ছোট্ট দুর্গা মায়ের পুজো হয়। বিশ্বাস পরিবারের কোন পুরুষ এই ছোট্ট অষ্টধাতুর দশভূজা মূর্তির পুজোর সূচনা করেছিলেন তা জানতে পারেন নি বর্তমান পরিবার সদস্যরা।
বিশ্বাস পরিবারের বর্তমান প্রবীণ সদস্য রাজারাম বিশ্বাস জানান, পাঁচশো বছরেরও বেশী সময় ধরে তাঁদের বংশের সদস্যরা ছোট্ট দশভূজা মায়ের পুজোপাঠ করে আসছেন। বর্তমানে বংশের সপ্তম পুরুষরা পুজোর আয়োজন করছেন। পুজোর চারটে দিন লোকাচার মেনেই পুজো হয়। পারিবারিক প্রথা মেনে অষ্টমীর সন্ধিপুজোর দিন ছাগ বলিদান, নবমীর দিন ছাঁচি কুমড়ো ও কলা বলিদেবার প্রথা এখনও চালু রয়েছে।

দশভূজা দেবী মায়ের নানা মাহাত্মের কথা জানিয়েছেন রাজারাম বাবু। তিনি বলেন, এরআগে একাধিকবার তাঁদের পরিবারের অষ্টধাতুর দশভূজার মূর্তিটি চুরি হয়ে গেলেও কোন না কোন ভাবে মূর্তিটি ফের বিশ্বাস বাড়িতে ফিরে এসেছে। ২০০৭ সালে মূর্তিটি চুরি হয়ে যায়। তা নিয়ে গ্রামে হুলস্থুল পড়ে যায়। ওই সময়কালে এলাকার একটি খালে জেলেরা যখন মাছ ধরছিল তখন তাঁদের জালে দেবী মূর্তিটি উঠে আসে। পুলিশ মূর্তিটি নিজেদের হেপাজতে নেয়। পরে মেমারি ও বর্ধমান থানা ঘুরে অষ্টধাতুর দশভূজা মায়ের মূর্তি ফের মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়। পরিবারের অন্য সদস্যরা বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষরা একদা মেমারির বসতপুর এলাকায় বসবাস করতেন। ওই সময়ে এক পূর্ব পুরুষের কাঁধে বাজপাখি উড়ে এসে বসে। তারপরেই ওই পূর্ব পুরুষ স্বপ্নাদেশ পান। সেই স্বপ্নাদেশ মেনে অষ্টধাতুর চার ইঞ্চির দেবী দশভূজা মায়ের মূর্তি গড়ে পরিবারে শুরু হয় পুজোপাঠ।

পূজারী কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবার সদস্যরা বলেন, ছোট্ট দশভূজা মাকে নিয়ে এলাকাবাসীর শ্রদ্ধা ও ভক্তি ভাবের অন্ত নেই। এই ছোট্ট দশভূজা মায়ের পুজোই নবস্থা এলাকার সবচেয়ে প্রাচীন দুর্গা পুজো। ঐতিহ্য পরম্পরা মেনে নবমীর দিন ১০৮টি পদ্মফুলের মালা দেবী মা’কে পরানো হয়। দেবী মায়ের বিধান মেনে বিজয়ার দিন এলাকার সকলে এখনও অপরাজিতা ফুলের তাগা ধারণ করেন। দশমীর পুজো শেষ হলে দশভূজার মূর্তি নাট মন্দির থেকে বাড়ি লাগোয়া মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। পুরোহিত বলেন, বিশ্বাস বাড়ির পুজোয় দশমীর দিন সিঁদুর খেলার কোন চল নেই।