সবার মুখে ভাত তুলে দিয়ে ওরা অন্নপূর্ণা

0
269
- Advertisement -

শুভজিৎ দত্ত : এক বছর আগেও ছবিটা এমন ছিল না। কেউ সবুজ সাথী সাইকেল নিয়ে স্কুলে যেত। কেউ বা কলেজে ক্লাস করে বাড়ি ফিরত বিকেলবেলায়। দিন আনি দিন খাই পরিবারে ওদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লড়াই ছিল। কিন্তু তার পাশাপাশি স্কুল-কলেজে যাওয়ার, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার আনন্দও ছিল। করোনা সব ছিনিয়ে নিয়েছে। ওদের দিনমজুর বাবা-মায়ের কাজ, ওদের স্কুল-কলেজ সবকিছু। তবু ওরা হার মানেনি। নতুন লড়াই শুরু হয়েছে। পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর লড়াই। এতদিন পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়ির কাজ করতে হত। এবার তার পাশাপাশি রোজগারের কথা ভাবতে হচ্ছে। আক্ষরিক অর্থেই ওরা সংসারে দশভুজা হয়ে উঠেছে।

বন্ধ রেডব্যাংক চা বাগানের মেয়ে ওরা। বাগান তো বন্ধ হয়েছে প্রায় এক দশক হল। বাবা-মা দিনমজুরি করে বা অন্য বাগানে কাজ করে ওদের বড় করেছেন। আর্থিক অনটন ওদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু ঘরে যেটুকু চাল-ডাল আসত তাও তো বন্ধ হয়ে গেল করোনা পর্বে। বাবা-মায়ের কাজ নেই। চেয়েচিন্তে কোনওমতে কয়েকমাস চলল। তারপর আর তো চলে না। তাই ওরা এগিয়ে এসেছে পরিবারের পাশে।  রেডব্যাংক চা বাগানের কয়েকশো কন্যাশ্রী এখন আশপাশের  চা বাগানে গিয়ে কাঁচা পাতা তোলার কাজ করছে। দিনের শেষে যা আয় হচ্ছে তা তুলে দিচ্ছে মা-বাবার হাতে।

একসময় টানা শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় গোটা দেশজুড়ে আলোড়ন ফেলে দেওয়া রেডব্যাংকে খোলা-বন্ধ থাকার পর্ব চলছিল ২০০৩ সাল থেকে। ২০১২-র দেবীপক্ষে বোনাস ইস্যুতে সেখানকার মালিকপক্ষ সেই যে বাগান ছেড়ে চলে যায় তারপর থেকে আর ফেরেনি। এরপর পাশের ডায়না নদী দিয়ে বয়ে গিয়েছে বহু জল। ঝাঁপ বন্ধ বাগানের ফ্যাক্টরির তালায় শুধুই মরচে ধরেছে। চাবির সন্ধান দিতে পারেননি দেশ বা রাজ্যের তাবড় মন্ত্রী-আমলাদের কেউই। বর্তমানে সরকারি সাহায্য ও অনুদানে কোনওরকমে বেঁচে আছে শ্রমিক পরিবারগুলো। লকডাউনের সময় সেখানকার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। দিনমজুরের কাজ করে বা লরিতে বোল্ডার বোঝাই করে যাদের রুজিরুটির সংস্থান হত তা বন্ধ হয়ে যায়। আনলক পর্বের এসে এখনও তা স্বাভাবিক হয়নি। পরিবারের এই অবস্থায় এগিয়ে এসেছে বাগানের কন্যাশ্রীরা। যারা একসময় সাইকেল বা বাসে স্কুল-কলেজে যেত তারা এখন কাকভোরে ট্রাক-ট্র‌্যাক্টরে করে বেরিয়ে পড়ছে আশপাশের ডায়না, চ্যাংমারি, কুর্তির মতো খোলা চা বাগানগুলিতে কাজ করতে। চায়ের ভরা মরশুমে বাগানগুলির ঠিকাশ্রমিকের প্রয়োজন হয়। সেই কারণে কাজ পেয়ে যাচ্ছে তারা। দিনের শেষে মিলছে ১৭৬ টাকা মজুরি। বাবা-মায়ে হাতে সেই টাকা তুলে দিচ্ছে ওরা।

রেডব্যাংক বাগানের বছর কুড়ির ইশিকা বাসমালি বলেন, লকডাউনের কারণে বাবা-মায়ের রোজ দিনমজুরির কাজ জোটে না। চারজনের সংসার। স্কুল-কলেজ বন্ধ বলে অন্য বাগানে গিয়ে পাতা তোলার কাজ করছি। মালের পরিমল মিত্র কলেজের ছাত্রী রেশমি ওরাওঁয়ের বাড়িতেও একই অবস্থা। তিনি বলছেন, বাবার কাজ নেই। কলেজও বন্ধ। তাই বাবার পাশে দাঁড়াতে অন্য বাগানে কাজে যাচ্ছি, করোনার ভয় আছে জেনেও। কয়েক মাস আগেও বানারহাটে একটি স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী অঞ্জলি ওরাওঁ এমন দিনের কথা ভাবতেও পারত না। এখন পারে। সে বলছে, কাজ করে দুপয়সা ঘরে আনলে সংসারের সুরাহা হয়। বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ালে নিজেরও ভালো লাগে। রেডব্যাংকের এক কর্মচারী সুশীল সরকার বলেন, প্রকৃত কন্যাশ্রী ওরাই। রোজ সকালে বহু মেয়ে কাজে গিয়ে এভাবেই নিজেদের সংসারকে টানছে। প্রত্যেককে স্যালুট। বাগানের পঞ্চায়েত সদস্য সবিতা ওরাওঁ বলছেন, ওরা পরিবারের মুখে ভাত জোগাচ্ছে। ওরা সত্যিই অন্নপূর্ণা।

- Advertisement -