ডান-বামের হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারে ভরছে পকেট 

73

সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি : গতবারের ভোট আর এবারের ভোট। দুবারের ভোটচর্চায় পার্থক্য কী? অনেকে অনেক কথাই বলবেন। কিন্তু একটা বিষয় কেউই অবজ্ঞা করতে পারবেন না যে এবারের ভোট নিয়ে চর্চাটা সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক বেশি প্রাণবন্ত। এই ট্রেন্ড বুঝতে পেরেই রাজনৈতিক দলগুলি সর্বত্র পুরোদস্তুর আইটি সেল খুলে বসেছে।

সব দলের আইটি সেলের কর্মীরাই রাজ্য থেকে ব্লকস্তর পর্যন্ত সাংগঠনিক কর্মসূচির প্রচারের পাশাপাশি ভোট ঘোষণার পর দলীয় প্রার্থীওয়াড়ি প্রচারের কাজ শুরু করেছেন। দ্রুত স্মার্টফোন ও অ্যাপ চালানোর পাশাপাশি স্টিল ফোটো ও ভিডিও এডিটিংয়ে কাজে কমবেশি পারদর্শী উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েosর এ কাজের জন্য বেছে নেওয়া হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় গজিয়ে ওঠা অজস্র পলিটিক্যাল গ্রুপ, পেজ, পোর্টাল, কমিউনিটিতে দল ও দলীয় প্রার্থীর পক্ষে এবং বিরোধী দলগুলির বিরুদ্ধে জনমত গড়ার জন্য পোস্ট, কমেন্ট, শেয়ার করতে রাজনৈতিক দলগুলি রীতিমতো প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এরপর এঁদের ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার, ইনস্টাগ্রামের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের দাযিত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই কাজে পেশাদারিত্ব আনতে আইটি সেলে কর্মরত এই কমবয়সি কর্মীদের মাসিক ভাতাও দেওয়া হচ্ছে। সিপিএমের পার্টি হোলটাইমার বা আরএসএস পরিচালিত সংগঠনগুলিতে যেভাবে পূর্ণকালীন বেতন বা ভাতাভুক দলীয় কর্মীরা রয়েছেন তাঁদের সঙ্গে অবশ্য আইটি সেলের কর্মীদের কোনও মিল নেই। নিছক পকেটমানি এবং দলের প্রতি ভালোবাসার টানেই উঠতি বয়সিদের এই কাজে ঝুঁকে পড়া।

- Advertisement -

তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে সোশ্যাল মিডিয়ায় বরাবরই সক্রিয়তা ছিল। তবে ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের পর ভোটকৌশলী পিকের লোকেরা দায়িত্ব নেওয়ার পর তৃণমূলে পুরোদস্তুর প্রশিক্ষিত আইটি সেল গড়ে তোলা হয়েছে। ভোট ঘোষণার আগে পর্যন্ত তৃণমূলের হয়ে ফেসবুক পোস্ট, কমেন্ট এবং শেয়ার করার কাজে যাঁরা যুক্ত ছিলেন পিকের সংস্থা আইপ্যাক তাঁদের মাসিক এক হাজার টাকা ভাতা দিত। দলের হয়ে পেজ বা গ্রুপ অ্যাডমিন হিসাবে যাঁরা কাজ করতেন তাঁরা আড়াই হাজার টাকা পেতেন। এছাড়া দলের বিধায়ক, জেলাস্তরের নেতা, কোঅর্ডিনেটরদের উপস্থিতিতে রাজনৈতিক কর্মসূচি বিষয়ক নির্দিষ্ট পেজ, গ্রুপে বা নিজস্ব ওয়ালে পোস্ট করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা মাসে হাজার তিনেক টাকা পেতেন। তবে ভোট ও দলের প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই এই কর্মীদের কাজ কয়েকগুণ বেড়েছে। ফলে তাঁদের মাসিক ভাতাও বাড়ানো হচ্ছে। দেড় বছর যাবৎ তৃণমূলের হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট সামলানো এক যুবক অবশ্য বলেন, এটা ঠিক পেশা নয়। দলের প্রতি ভালোবাসা ও নেশার টানেই কাজটা করি। যে টাকাটা পাই তা নেট প্যাক ভরতেই শেষ। ভোটের পর কী হবে জানি না। তবে এখন প্রতিদিন হাতে প্রচুর কাজ পাই।

ভোট রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়ার এই দাপট বুঝে বিজেপিই দেশে প্রথম সংগঠিত আইটি সেল গড়ে তোলে। রাজ্য বিধানসভা ভোটে পদ্ম শিবিরের সেই টেকস্যাভি বাহিনী দারুণ সক্রিয়। বর্তমানে সর্বভারতীয় বিজেপি নেতা অমিত মালব্যের নজরদারিতেই রাজ্যে বিজেপি আইটি সেল সক্রিয়ভাবে কাজ করে চলেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দলের হয়ে প্রচারের পাশাপাশি শাসকদলের প্রচারের পালটাও দেওয়া হচ্ছে। এজন্যে আইটি কর্মীরা প্রতিনিয়ত প্রতিটি ঘটনার ছবি, ভিডিও সংগ্রহ এডিট এবং তা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করছেন। বিজেপি সূত্রে খবর, ব্লকস্তরে আইটি সেলের মূল দায়িত্ব যাঁরা পালন করছেন তাঁরা মাসিক আট হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন। এঁদের নীচে থাকা বুথস্তর পর্যন্ত সদস্যরা প্রতিনিয়ত দলের হয়ে কাজ করে চলেছেন। ভোট ঘোষণার পর প্রতিটি প্রার্থী, দল ও শাখা সংগঠনের নেতা-নেত্রীদের সঙ্গেও আইটি সেলের কর্মীরা ২৪ ঘণ্টা থাকছেন। এ কাজে যুক্ত জেলাস্তরের এক কর্মীর কথায়, আমাদের মূল কাজ দল ও প্রার্থীর কর্মসূচি রেকর্ড করে তা গ্রুপে পাঠানো, তারপর এডিট করে তা শেয়ার করা।

একসময় দলীয় ব্যানারে প্রার্থীর ছবি দিতে আপত্তি করা বামেরাও গত কয়েক বছরে পোস্টারে প্রার্থীর ছবি দেওয়ার পাশাপাশি দারুণভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে তৃণমূল বা বিজেপির মতো পেশাদার আইটি সেল গড়ার বদলে মূলত বাম ছাত্র-যুবরাই দল ও দলীয় প্রার্থীদের হাইটেক প্রচারের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। ধূপগুড়ির প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক তথা দলের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য মমতা রায় বলেন, তৃণমূল বা বিজেপিতে টাকার বিনিময়ে পোষা পেশাদার আইটি সেলগুলি মূলত গুজব ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। আমাদের ছাত্র-যুবদের মিথ্যে বলা বা প্রচারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। তাই আমাদের আইটি সেল নেই। ছাত্র-যুবরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই দলের হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার সামলান।

রাজনৈতিক দলগুলির হয়ে নেটদুনিয়া কাঁপানো এই আইটি সেলের কর্মীদের মধ্যে অবশ্য আশঙ্কাও রয়েছে। এমনই এক কর্মীর কথায়, মাসে যা পাচ্ছি তা দিয়ে টুকটাক হাতখরচ, বাইকের তেলের খরচ হয়ে যাচ্ছে। ভোট মিটলে তা মিলবে কি না কে জানে। পাশাপাশি, অনেকেই কমেন্টে হুমকি দিয়ে রেখেছে। সেটাও ভয়ের।