সংসার চালাতে বই ছেড়ে হাতে কোদাল-বেলচা

70

জ্যোতি সরকার, জলপাইগুড়ি : প্রায় এক দশক ধরে বন্ধ রায়পুর চা বাগান। সেই বাগানের সঙ্গে যুক্ত ছিল যেসব পরিবার, তাদের পক্ষে এখন সংসার চালানোই সমস্যাজনক। সেসব পরিবারের ছেলেমেয়েরা তাই সংসার চালানোর কাজের ভার নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছে। লাটে উঠেছে তাদের স্কুলে যাওয়া। শিকেয় উঠেছে পড়াশোনা। শতাধিক স্কুল পড়ুয়া পড়াশোনায় ইতি টেনে পরিবারের স্বার্থে হাতে কোদাল-বেলচা নিয়ে দিনমজুরির কাজ করছে।

একাদশ শ্রেণির মনোজিৎ মুন্ডা, দশম শ্রেণির রাজ ওরাওঁ, নবম শ্রেণির করণ ওরাওঁ, অষ্টম শ্রেণির অর্জুন মুন্ডাদের এখন আর বইয়ের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। সকাল হলেই দিনমজুরির সন্ধানে ওরা বেরিয়ে পড়ে। করোনা পরিস্থিতির কারণে এখন সেটুকুও প্রতিদিন জুটছে না। ভোটের আগে বাগানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ভিড় লক্ষ্য করা গেলেও সেসব মিটে যাওয়ার পর এখন আর কোনও নেতা পা দিচ্ছেন না বাগানে।

- Advertisement -

বাগানের বাসিন্দা নন্দ মুন্ডা বলেন, রায়পুর চা বাগান থেকে রাজগঞ্জ কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী খগেশ্বর রায় ছয় শতাধিক ভোটে জয়ী হয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের এই বিপুল সাফল্যের পরও কোনও নেতাকেই বাগানে আসতে দেখিনি। এলাকায় কেবল দেখা যাচ্ছে শুধু রায়পুর চা বাগানের শ্রমিক তথা পাতকাটা গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান প্রধান হেমব্রমকে। আমাদের ছেলেমেয়েরা অর্থাভাবের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। প্রতিশ্রুতির ফিরিস্তি দেওয়া হলেও বন্ধ রায়পুর চা বাগানের তালা খুলছে না। কবে খুলবে, সে প্রশ্নের উত্তরও পাচ্ছি না।বিধায়ক খগেশ্বর রায় অবশ্য বাগানের স্কুলছুট শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ চা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।

বাগানের চা গাছের পাশেই ছায়াগাছ। এই ছায়াগাছের তলায় বসে থাকতে দেখা গেল মনোজিৎ, করণ, রাজ, অর্জুনদের। মনোজিৎ জানাল, বিভিন্ন দফায় দশ বছর ধরে রায়পুর চা বাগান বন্ধ। শুধুমাত্র ত্রাণের উপর নির্ভর করে সংসার চলে না। একাদশ শ্রেণির এই ছাত্রটি জানাল, বাধ্য হয়ে দিনমজুরির কাজ করছি। সকাল হলেই বেরিয়ে পড়ি কাজের সন্ধানে। দিনমজুরি করে সামান্য যে উপার্জন করি তা বাবা-মায়ে হাতে তুলে দিই। ইচ্ছে ছিল উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার। কিন্তু আর কোনও উপায় নেই।

করণ জানাল, কাজের সন্ধানে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। তাই বাগানের ছায়াগাছের তলায় আমরা কিছুটা জিরিয়ে নিচ্ছি। বাগান খোলার কোনও লক্ষণ নেই। ইচ্ছা থাকলেও পড়াশোনা করতে পারছি না। বাগানেরই বাসিন্দা নন্দ মুন্ডা বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ায় খুব দুঃখ হয়। সরকারের উচিত কালবিলম্ব না করে রায়পুর চা বাগানের তালা খোলার ব্যবস্থা করা।